ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ: দিনের বেলায় ফাঁকা ফুটপাত, স্বস্তিতে চলাচল; কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় নারায়ণগঞ্জ মহানগরীর চিত্র। শহরের চাষাঢ়া, কালিরবাজার ও ২নং রেলগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় আবারও পলিথিন বিছিয়ে বসে পড়ছেন হকাররা। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও রাতের এই অনিয়ন্ত্রিত বাজার যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের যৌথ উদ্যোগ নারায়ণগঞ্জ মহানগরী হকার মুক্ত করার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগের কথা বলেছেন নাসিক প্রশাসক। তিনি স্থানীয় হকারদের আলাদা জায়গায় সান্ধ্যকালীন হকার মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিতে যাচ্ছেন।
প্রশাসনের কঠোরতার মধ্যেই শহরের চাষাঢ়া, কালিরবাজার ও ২নং রেলগেটসহ আশপাশ এলাকায় কিছু কিছু হকার বসে। পুলিশের গাড়ি দেখলেই আবার পালিয়ে যায়। তবে নারায়ণগঞ্জ কলেজের সামনে থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত সিরাজউদ্দৌলা সড়কের পশ্চিম পাশ ফের যেনো দখল হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর এই সড়কে হকাররা দোকান সাজায়।
এদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় হকারদের আইডি কার্ড দিয়ে শহরের একটি ভিন্ন জায়গায় সান্ধ্যকালীন হকার্স মার্কেট নির্মাণ করার কথা পরিকল্পনাধীন বলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সূত্রগুলো জানিয়েছে। দিনের বেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়কে হকার বসা সম্পূর্ণ নিষেধ থাকবে। সান্ধ্যকালীন হকার্স মার্কেটই হবে স্থানীয় (নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা) হকারদের স্থায়ী ঠিকানা।
বিভিন্ন জেলা থেকে আগত লোকজন যারা নারায়ণগঞ্জে এসে ফুটপাতে হকার সেজে ব্যবসা করেন, তাদের নিজের জেলায় ফিরে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হবে। নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় হকারদের পুনর্বাসনে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে পূর্ণাঙ্গ বায়োডাটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আলাদা জায়গায় নির্মিত সান্ধ্যকালীন হকার্স মার্কেটে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হবে, এর অন্যথা হবে না। জানা গেছে, দিনভর প্রশাসনের কড়াকড়িতে ফুটপাত থাকে ফাঁকা এবং সড়ক থাকে তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক। কিন্তু সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে যেন বদলে যায় শহরের চেহারা। অন্ধকার নামতেই নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া, কালিরবাজার ও ২নং রেলগেট এলাকা দখল হয়ে যায় পলিথিন বিছানো অস্থায়ী দোকানে। পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনামাত্রই ছোটাছুটি, কিন্তু কিছু সময় পর আবারও আগের অবস্থায় ফিরে আসে সবকিছু। যেন এক অদৃশ্য চক্রে আবর্তিত হচ্ছে নগরীর ফুটপাত দখলের গল্প।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত সিরাজউদ্দৌলা সড়কের পশ্চিম পাশে সন্ধ্যার পর দৃশ্যটি সবচেয়ে প্রকট। দিনের বেলা যেখানে পথচারীরা স্বস্তিতে চলাচল করেন, সেখানে রাত নামতেই হকারদের দখলে চলে যায় পুরো ফুটপাত। পলিথিন বিছিয়ে সাজানো হয় নানা পণ্যের সম্ভারÑকাপড়, জুতা, খেলনা ও ফলমূল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। অস্থায়ী এই বাজারে ভিড়ও কম নয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কাছে সস্তা দামের কারণে এই বাজার হয়ে উঠছে আকর্ষণের কেন্দ্র।
তবে এই চিত্র নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দখল করে হকার বসার প্রবণতা রয়েছে। সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের ফলে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরে এলেও সন্ধ্যার পর সেই শৃঙ্খলা যেন ভেঙে পড়ে। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান দিনের বেলায় কার্যকর থাকলেও রাতের বেলায় তা অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েÑএমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, দিনে ভালোই লাগে, হাঁটা যায়; কিন্তু সন্ধ্যার পর আবার আগের মতো হয়ে যায়। হকাররা বসে, ভিড় বাড়ে এবং চলাচল কষ্টকর হয়ে পড়ে। আরেকজন পথচারী জানান, পুলিশ এলে তারা দৌড়ে পালান, কিন্তু পুলিশ চলে গেলেই আবার বসে পড়েন। এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) একটি নতুন পরিকল্পনা হাতে নিতে যাচ্ছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের আদলে স্থানীয় হকারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে ‘সান্ধ্যকালীন হকার্স মার্কেট’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। নাসিকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুধু নারায়ণগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা হকারদেরই এই মার্কেটে জায়গা দেওয়া হবে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্যদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে দোকান বসানোর অনুমতি দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন হকারদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা যাবে, অন্যদিকে শহরের প্রধান সড়কগুলোও থাকবে হকারমুক্ত।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post