হাসান সিরাজী: সেদিন বিকালের কথা। ক্যাম্পাসের কাছের একটা টং দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, পাশের বেঞ্চে বসা এক ভিনদেশি তরুণ বেশ কসরত করে ভাঙা ভাঙা বাংলায় দোকানদারকে বলছে, ‘মামা, আরেক কাপ চা দিন, তবে চিনি কম।’ দৃশ্যটা দেখে অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটির বাড়ি হয়তো নেপাল, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া কিংবা মালদ্বীপে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে আমাদেরই একজন।
এই যে ভিনদেশি ছেলেমেয়েরা আমাদের দেশে পড়তে আসছে, এটা কিন্তু শুধুই একটা সাধারণ দৃশ্য নয়; এটা আমাদের জন্য একটা বিরাট সম্ভাবনার গল্প।
একটা সময় ছিল যখন আমরা ভাবতাম, উচ্চশিক্ষার জন্য শুধু আমাদের ছেলেমেয়েরাই বুঝি বিদেশে যায়। আমেরিকা, ইউরোপ বা নিদেনপক্ষে ভারত কি মালয়েশিয়ায়। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। এখন আশপাশের নানা দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আমাদের এখানেও আসছে। মূলত ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি বা সাধারণ বিষয়গুলোতে পড়তে তারা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছে। কারণ কী? কারণ আমাদের পড়াশোনার মান অনেক ক্ষেত্রেই বেশ ভালো এবং ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় খরচও অনেক কম। আমরা যদি একটু সচেতনভাবে এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারি, তাহলে আমাদের দেশটা খুব সহজেই হয়ে উঠতে পারে শিক্ষার একটা আন্তর্জাতিক কেন্দ্র বা ‘এডুকেশনাল হাব’।
ভেবে দেখুন তো, একটা ক্লাসরুমে যখন চার-পাঁচটা দেশের ছেলেমেয়ে একসঙ্গে বসে ক্লাস করে, তখন সেখানে শুধু বইয়ের জ্ঞান আদান-প্রদান হয় না; সেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতিরও একটা চমৎকার মেলা বসে। আমাদের নিজেদের ছেলেমেয়েরা পৃথিবীটাকে আরও বড় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখে। তাদের চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়।
তা ছাড়া, এর একটা বড় অর্থনৈতিক দিকও আছে। এই যে বিদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আসছে, তারা তো এখানে থাকছে, খাচ্ছে, যাতায়াত করছে। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিতে বৈধভাবেই বিদেশি মুদ্রা যোগ হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, একটা দেশ যখন শিক্ষার হাব হয়ে ওঠে, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই দেশের ভাবমূর্তি এমনিতেই অনেক উজ্জ্বল হয়ে যায়।
কিন্তু শুধু স্বপ্ন দেখলেই তো আর হবে না, আমাদের কিছু বাস্তব সমস্যার দিকেও তাকাতে হবে। একজন অতিথি যখন আমাদের ঘরে আসে, আমরা তো তাকে সেরা আরামটাই দিতে চাই, তাই না? বিদেশি শিক্ষার্থীরা এখানে এসে যেন নিরাপদ আবাসন এবং ভালো খাবারের সুবিধা পায়, সেদিকে নজর দেওয়া খুব জরুরি। অনেক সময়ই শোনা যায়, তাদের ভিসা পেতে বা ভিসার মেয়াদ বাড়াতে গিয়ে নানা রকম সরকারি জটিলতায় পড়তে হয়। ক্যাম্পাসের ভেতরে ভাষাগত সমস্যা বা একাকিত্ব কাটানোর জন্যও খুব বেশি সহায়তা তারা পায় না।
এই জায়গাগুলোতেই আমাদের কাজ করতে হবে। সরকারি নীতিগুলোকে আরও সহজ করতে হবে, যাতে ভিনদেশি ছাত্রছাত্রীরা কোনো রকম হয়রানি ছাড়া এখানে আসতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও বেশি শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের হোস্টেল, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা হেল্প ডেস্ক এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
শুরুতে বলা সেই টং দোকানের ভিনদেশি তরুণটির কথায় আবার ফিরে যাই। পড়াশোনা শেষে ও যখন তার নিজের দেশে ফিরে যাবে, তখন সে কিন্তু শুধু একটা সার্টিফিকেট নিয়ে যাবে না; সে নিয়ে যাবে আমাদের দেশের গল্প। সে তার বন্ধুদের বলবে এখানকার মানুষের আন্তরিকতার কথা, ক্যাম্পাসের আড্ডার কথা, আমাদের আতিথেয়তার কথা। এভাবেই একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হয়ে উঠতে পারে বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের অলিখিত রাষ্ট্রদূত।
সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষÑআমাদের সবাইকেই এই সুযোগটা কাজে লাগানোর কথা ভাবতে হবে। শিক্ষার এই আলো শুধু নিজেদের গণ্ডিতে আটকে না রেখে, চলুন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিই। কে বলতে পারে, একটু সদিচ্ছা আর সঠিক পরিকল্পনায় আগামী দিনে হয়তো আমাদের এই প্রিয় দেশটাই হয়ে উঠবে বিশ্বের অন্যতম সেরা এক এডুকেশনাল হাব!
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post