হাসান শিরাজী: শিক্ষার জগৎ খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজ থেকে কয়েক বছর পর হয়তো ঢাকার কোনো এক শিক্ষার্থী সকালে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে কাজ করবে, আর বিকালে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে অংশ নেবে হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের কোনো সেমিনারে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের সেরা শিক্ষকদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করা এখন আর কল্পকাহিনি নয়। এই যে সীমানাহীন, প্রযুক্তিনির্ভর এবং উš§ুক্ত শিক্ষার ধারণাÑএকেই বলা হচ্ছে ‘মেটা-ইউনিভার্সিটি’।
২০৩০ সাল নাগাদ উচ্চশিক্ষার চেহারাটা কেমন হবে, তা নিয়ে সারাবিশ্বেই এখন জোর আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তখন আর চার দেয়ালের মধ্যে শিক্ষার গণ্ডি আটকে থাকবে না। মেটা-ইউনিভার্সিটি এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করবে যেখানে অনলাইন এবং অফলাইন দুটো মিলিয়েই চলবে পড়াশোনা। তখন হয়তো একজন শিক্ষার্থী শুধু একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর টানা চার বছর পড়ে ডিগ্রি নেবে না; বরং নিজের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছোট ছোট অনেকগুলো ‘মাইক্রো-কোর্স’ বা স্কিল শিখে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলবে।
এর মানে এই নয়, আমাদের চিরচেনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যাবে। বরং সেগুলো হয়ে উঠবে আইডিয়া শেয়ারিং বা দলগত কাজের মূল কেন্দ্র। তাত্ত্বিক পড়াশোনা বা লেকচার হয়তো শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই প্রযুক্তির সাহায্যে শিখে নেবে, কিন্তু গবেষণার কাজ, রোবোটিক্স বা বড় কোনো প্রজেক্টের জন্য তারা ক্যাম্পাসে আসবে।
এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আমাদের এখনই প্রস্তুত হতে হবে। নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের জন্য নিচের বিষয়গুলো এখনই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন।
প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমানো: সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে যেন গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও সুলভ মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ডিভাইস পায়। সবার কাছে প্রযুক্তি না পৌঁছালে এই মেটা-ইউনিভার্সিটির সুফল কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছেই আটকে থাকবে।
সনদ ও সনাতনী নিয়মে পরিবর্তন: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) গতানুগতিক ডিগ্রির পাশাপাশি ‘মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল’ বা ছোট ছোট স্কিলভিত্তিক কোর্সের সনদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভাবতে হবে। এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের নিয়ম আরও সহজ করা জরুরি।
শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ: আমাদের শিক্ষকদেরও নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। কীভাবে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বা নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে আরও কার্যকরভাবে পড়ানো যায়, সে বিষয়ে তাদের জন্য নিয়মিত ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
মুখস্থবিদ্যার বদলে দক্ষতা: সিলেবাস এমনভাবে সাজাতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য না পড়ে, বাস্তবজীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে শেখে। এ জন্য শিল্প ও করপোরেট খাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরাসরি সমন্বয় থাকতে হবে।
২০৩০ সাল খুব বেশি দূরে নয়। মেটা-ইউনিভার্সিটির যুগে প্রবেশের জন্য আমাদের হাতে প্রস্তুতির সময় বেশ কম। আমরা যদি এখনই পুরোনো খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে না পারি, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমাদের তরুণরা অনেকটাই পিছিয়ে পড়বে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎমুখী করার এ উদ্যোগ আমাদের নিতে হবে আজ থেকেই।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post