নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশজুড়ে ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ ঘিরে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে মোট ব্যয় ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে; যা প্রায় ৩৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে হঠাৎ ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় চাহিদার কথা উল্লেখ করে নতুন নতুন স্কিম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সামনে আসায় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও নতুন স্কিমগুলোর প্রয়োজনীয়তা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং প্রকৃত উপকারভোগী কারাÑএসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সংস্কার ও সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়। মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, শ্মশানসহ নানা স্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং জনসেবার মানোন্নয়নই এর মূল লক্ষ্য। ২০২২ সালের মার্চে একনেক সভায় অনুমোদনের পর একই বছরের জুলাই থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়মতো বরাদ্দ না পাওয়া এবং মাঠপর্যায়ে কাজের ধীরগতির কারণে এই সময় বৃদ্ধি প্রয়োজন হয়েছে। তবে পরিকল্পনার সময় যথাযথ বাস্তবতা বিবেচনায় না নেওয়ার ফলেই সময় ও ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, নির্মাণ সামগ্রীর দাম ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের দর তালিকার ভিত্তিতে প্রাথমিক প্রাক্কলন করা হলেও পরবর্তীতে ২০২২ ও ২০২৩ সালে তা সংশোধন করা হয়, যার প্রভাব পড়ে মোট ব্যয়ে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাজারদর বৃদ্ধি দিয়ে পুরো ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না; পরিকল্পনার সময় বাস্তবসম্মত হিসাব না থাকাও বড় কারণ।
এদিকে নতুন স্কিম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও ব্যয় বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের চাহিদার ভিত্তিতে প্রকল্পে নতুন কাজ যুক্ত হওয়ায় এর পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ হাজার ৫৫০টি প্রতিষ্ঠানে উন্নয়ন কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি, তদারকির দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে কাজের গুণগত মান বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে কাজের ধীরগতি ও পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির অমিলের অভিযোগ উঠেছে।
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৬৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ হলেও বাস্তব অগ্রগতি তুলনামূলক কম বলে জানা গেছে। অর্থাৎ অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা, আউটসোর্সিং, ভ্রমণ, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রশাসনিক খাতেও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা বৃদ্ধি এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তও ব্যয় বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা, এলাকাভিত্তিক বরাদ্দের ভারসাম্য এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিছু জেলায় বেশি এবং কিছু জেলায় কম বরাদ্দের বিষয়টি সুষম উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কমিশন সুস্পষ্ট ক্রয়পরিকল্পনা প্রণয়ন, পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮ অনুসরণ এবং প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা পৃথকভাবে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে দ্বৈত অর্থায়ন এড়াতে অন্য কোনো উৎস থেকে অনুদান পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়, তবে যখন সেই বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হয় এবং বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে না, তখন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
অন্যদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় জনগণের চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে নতুন স্কিম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির কারণেও ব্যয় বেড়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পের পরিধি বাড়ার ফলে এর কার্যকারিতা বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন আরও ভালোভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post