শিক্ষা ডেস্ক: ড. শফিকুর রহমান (ছদ্মনাম)। ইউরোপের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরেছেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। যোগ দিয়েছেন দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। তার স্বপ্নÑক্যাম্পাসে নবায়নযোগ্য শক্তির (রিনিউয়েবল এনার্জি) ওপর একটি আধুনিক ল্যাব তৈরি করবেন, যেখানে তার ছাত্ররা সস্তায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে।
ড. শফিকের এই আইডিয়া শুনে দেশের একটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ল্যাব তৈরির মোট খরচের অর্ধেক অনুদান দিতে রাজি হলো। আনন্দে আত্মহারা শফিকুর রহমান ছুটলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে। কিন্তু সেখানে গিয়েই তার স্বপ্নের হোঁচট খাওয়া শুরু।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন জানাল, বেসরকারি অনুদান সরাসরি গ্রহণ করার আইনি প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। এর জন্য সিন্ডিকেটের অনুমোদন, সরকারি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নানা নিয়মের বেড়াজাল পার হতে হবে। মাসের পর মাস ফাইল ঘুরতে লাগল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে। লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে বিরক্ত হয়ে একসময় করপোরেট প্রতিষ্ঠানটি তাদের অনুদান ফিরিয়ে নিল। ড. শফিকের ল্যাবটি আর আলোর মুখ দেখল না।
এটি শুধু ড. শফিকের একার গল্প নয়। দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়ালে কান পাতলে এমন শত শত আক্ষেপের গল্প শোনা যায়।
আমরা কথায় কথায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘স্বায়ত্তশাসিত’ বা স্বাধীন বলি। কিন্তু সত্যিই কি তারা স্বাধীন? একটা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনভাবে চলতে পারে তখনই, যখন তার নিজের পকেটে টাকা থাকে এবং সেই টাকা সে নিজের গবেষণায় বা উন্নয়নের কাজে স্বাধীনভাবে খরচ করতে পারে। বর্তমানে আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেটের ৯৫ শতাংশের বেশি আসে সরকারের কাছ থেকে। যিনি টাকা দেন, স্বভাবতই তার একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে পড়েছে পরনির্ভরশীল।
অন্যদিকে, প্রশাসনিকভাবেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন শেকলবন্দি। উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোয় নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে একটি স্বাধীন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে গতিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা সম্ভব হচ্ছে না।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পুরোনো আইনি কাঠামো দিয়ে চালালে চলবে না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার জন্য এখন একটি নতুন, যুগোপযোগী ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো বা লেজিসলেটিভ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা সময়ের দাবি।
কী থাকতে পারে সেই নতুন আইনি কাঠামোতে? দেশের নীতিনির্ধারক বা আইনপ্রণেতাদের জন্য এখানে কিছু বাস্তবসম্মত রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
১. আর্থিক স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত ও এনডাওমেন্ট ফান্ড:
নতুন আইনে প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নিজস্ব ‘এনডাওমেন্ট ফান্ড’ বা স্থায়ী তহবিল গঠনের আইনি বৈধতা থাকতে হবে। প্রাক্তন শিক্ষার্থী (অ্যালামনাই), দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থা এবং দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেন নির্দ্বিধায় এই তহবিলে অনুদান দিতে পারে; আইনে তার সহজ পথ করে দিতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলোÑযেসব প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুদান দেবে, সরকারকে তাদের জন্য ‘ট্যাক্স রিবেট’ বা কর ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে। এই ফান্ডের লভ্যাংশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের গবেষণা, ল্যাব উন্নয়ন ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারবে। সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।
২. প্রশাসনিক নিয়োগে মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় পদÑউপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং ট্রেজারার। এই পদগুলোয় নিয়োগের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত হতে হবে। নতুন আইনে এমন একটি স্বাধীন ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের বিধান থাকতে হবে, যারা দেশ ও বিদেশের স্বনামধন্য শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। তারা আবেদনকারীদের একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব, গবেষণার ট্র্যাক রেকর্ড এবং প্রশাসনিক দক্ষতা যাচাই করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি জ্ঞানভিত্তিক করপোরেশনের মতো পরিচালনা করার প্রশাসনিক স্বাধীনতা এই শীর্ষ কর্তাদের দিতে হবে।
৩. সিলেবাস ও কোর্স কারিকুলাম আপডেটের স্বাধীনতা: বর্তমানে একটি কোর্সের সিলেবাস পরিবর্তন বা নতুন একটি আধুনিক বিষয় যুক্ত করতে গেলে বছরের পর বছর লেগে যায়। একাডেমিক কাউন্সিল থেকে শুরু করে নানা কমিটির অনুমোদন নিতে হয়। নতুন আইনে বিভাগগুলোকে এই স্বাধীনতা দিতে হবে, যেন তারা বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুততম সময়ে কারিকুলাম আপডেট করতে পারে।
৪. শিল্প ও একাডেমিয়ার সেতুবন্ধন: আমাদের দেশের একটা বড় সমস্যা হলোÑবিশ্ববিদ্যালয় কী পড়াচ্ছে আর চাকরির বাজারে কী দরকার, তার মধ্যে কোনো মিল নেই। নতুন আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে দেশের শিল্প খাতের (ইন্ডাস্ট্রি) সরাসরি চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আসবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে, আর শিক্ষকরা ছাত্রদের নিয়ে তা সমাধান করবেন। বিনিময়ে ইন্ডাস্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থ দেবে। এই আয় থেকে গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় উভয়েই লাভবান হবেন, আইনে এমন ‘পেটেন্ট ও রেভিনিউ শেয়ারিং’-এর স্পষ্ট ধারা থাকতে হবে।
৫. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার কঠোর মাপকাঠি: স্বাধীনতা মানেই কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতা নয়। অনেক সমালোচক ভয় পান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পুরোপুরি ছেড়ে দিলে সেখানে অনিয়ম বাড়বে। এই ভয় দূর করার দায়িত্বও আইনের। নতুন লেজিসলেটিভ ফ্রেমওয়ার্কে কঠোর জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিবছর বাধ্যতামূলকভাবে দুটি অডিট হতে হবেÑএকটি আর্থিক অডিট এবং অন্যটি একাডেমিক অডিট। একাডেমিক অডিটে দেখা হবে, সারাবছর শিক্ষকরা কী গবেষণা করলেন, কয়টি আন্তর্জাতিক মানের প্রবন্ধ প্রকাশ হলো এবং ছাত্রদের মান কতটা বাড়ল। এই রিপোর্টগুলো জনগণের জন্য উš§ুক্ত থাকতে হবে। যারা ভালো করবেন, তারা পুরস্কৃত হবেন; আর যারা পিছিয়ে পড়বেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
৬. ফি-কাঠামো সংস্কার এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হলে একসময় হয়তো তাদের টিউশন ফি কিছুটা বাড়াতে হতে পারে। তবে এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সংবিধানে সবার শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা আছে। তাই আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে, ফি বাড়লেও তা দিয়ে একটি বিশাল ‘স্কলারশিপ ফান্ড’ বা বৃত্তি তহবিল গঠন করতে হবে। কোনো মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থী যেন অর্থের অভাবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই গ্যারান্টি আইনে থাকতে হবে। যাদের টাকা আছে, তারা পুরো ফি দিয়ে পড়বেন; আর যারা আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, তারা ওই ফান্ড থেকে বৃত্তি নিয়ে বিনামূল্যে পড়বেন।
শেষের কথা: গল্পের শুরুতে বলা ড. শফিকের কথায় আবার ফিরে যাই। আমাদের দেশে মেধার কোনো অভাব নেই। অভাব শুধু একটি সঠিক সিস্টেম বা কাঠামোর।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সরকারি অফিস নয় যে, ৯টা-৫টা নিয়মে চলবে আর ফাইল চালাচালি হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে ভুল করার স্বাধীনতা থাকবে, নতুন কিছু আবিষ্কারের উত্তেজনা থাকবে এবং মুক্তচিন্তার বাতাস বইবে।
২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) কিংবা ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণের জন্য আমাদের এমন একটি প্রজš§ দরকার, যারা সারাবিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে। সত্তর বা নব্বই দশকের পুরোনো আইন আর আমলাতান্ত্রিক শেকল দিয়ে এই ভবিষ্যৎ প্রজš§কে আটকে রাখা বড় ভুল হবে। নীতিনির্ধারকদের এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত অর্থে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে স্বাধীন করার জন্য একটি নতুন আইনি কাঠামো প্রণয়নের কাজে আমাদের আজই হাত দিতে হবে। কারণ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলো শৃঙ্খলমুক্ত না হলে, একটি জাতি কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post