রায়হান আহমেদ তপাদার: সামাজিক সুরক্ষা বা বৃহত্তর অঙ্গনে সামাজিক কল্যাণ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্ব নিহিত তার নিজের জন্য নয়, বরং প্রবৃদ্ধি হচ্ছে মানুষের হাতে একটা অস্ত্রের মতো; যা পছন্দমতো কিছু করার জন্য তাকে সমর্থ করে তোলে’। এটা সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যার মতো বিষয় মানুষের জীবনের গুণগতমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, এগুলো মানুষকে নিজের এবং বড় পরিসরে সমাজের চাহিদা ভালোভাবে পূরণে সক্ষম করে তোলে। দিন শেষে, প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন একটা উদ্দেশ্যসাধনের জন্য এবং সে উদ্দেশ্যটি হচ্ছে মানবজীবনের মান উন্নীত করা। বাংলাদেশ গেল কয়েক দশকে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কিন্তু প্রবৃদ্ধির সুফল সবার ঘরে পৌঁছেনি বলে অরক্ষিত ও বঞ্চিতদের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ বন্দোবস্তের অন্য নাম সামাজিক সুরক্ষা। বাংলাদেশে সব নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করে না এবং সবাই সমানভাবে উন্নয়নের সুযোগ পায় না। এখানে আয়বৈষম্যও দিন দিন বাড়ছে। ফলে দেশের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলো উন্নয়নের সুফল থেকে বহুলাংশে বঞ্চিত থাকছে। এদের প্রতি রাষ্ট্রের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বেগবান করার জন্য বর্তমান সরকার দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করে মানবিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সবার কল্যাণ সাধন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। কিন্ত এখনে বেশ কিছ– উদ্বেগের বিষয়ও আছে। গত সরকারের আমলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক গবেষণা ফলাফলে বলেছিল-স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাজেটের ৬৫ শতাংশ গিয়েছে দরিদ্র নয় এমন মানুষের হাতে।
এ গবেষণা অনুসারে দেশের মাত্র ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ দরিদ্র পরিবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে কিছু সাহায্য পেয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবন-জীবিকার জন্য ব্যাপক হারে বাজেট কমে যাওয়া আরেকটি উদ্বেগের বিষয় ছিল। আশা করি নতুন সরকার এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখবেন। বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে অনিশ্চয়তাই যেন একমাত্র স্থির বাস্তবতা। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কঠোর মুদ্রানীতি-সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের কর্ণধার ল্যারি ফিংক সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছে, তাহলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন এক মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তার এই বক্তব্য একটি নেতিবাচক অনুমান হলেও বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ। তেলের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আধুনিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাত; যেমনÑ পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা, কৃষি উৎপাদন-সবই কোনো না কোনোভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দামের উল্লম্ফন সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তেলের বাজারের অস্থিরতা প্রায়ই বড় অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস হয়ে উঠেছে। ১৯৭০ দশকের তেল সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছিল। একইভাবে ২০০৮ সালের গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের সময়ও তেলের উচ্চমূল্য অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল। যদিও ওই সংকটের মূল কারণ ছিল আর্থিক খাতের দুর্বলতা, তবু জ্বালানির উচ্চব্যয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। অনেক দেশ এখনো মহামারির ধাক্কা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের মতো সংঘাত, যা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। যদি এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছে যায়, তাহলে তা অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং এর প্রভাবে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। যেমনÑ তেলের উচ্চমূল্য সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, যা ভোক্তা ব্যয় হ্রাস করবে। আর ভোক্তা ব্যয় কমে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়বে। শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, যা আবার অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা সুদহার বাড়াতে পারে, কিন্তু এতে বিনিয়োগ ও ঋণ গ্রহণ কমে যায়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ধীর হয়ে পড়ে। এই দ্বৈত সংকট উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কম প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ। এতে রিজার্ভ কমে যায়, মুদ্রার মান পড়ে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হয়, যা বাজেট ঘাটতি বাড়াবে।
বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করতে শুরু করবেন। ফলে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক থাকবে না।
সব শেষে বলা যায়, তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছানো মানে শুধু জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এমন নয়। এটি একটি চেইন রি-অ্যাকশন তৈরি করবে, যা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। এই বাস্তবতায় বিশ্বনেতাদের উচিত আগাম প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে সম্ভাব্য সংকটের প্রভাব কমানো যায়। অন্যথায় ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে পারে। আর সেই পুনরাবৃত্তি হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশ্লেষকদের ধারণা, বৈশ্বিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে করা হলেও আমাদের দেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশে এই ধাক্কা আরও কঠিন হতে পারে। তেলের দাম যদি সত্যি ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছে, তাহলে এটি শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য হুমকি, তা ভাবা উচিত নয়। এটি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের জন্য তা সরাসরি জীবনযাত্রার ওপর আঘাত হানবে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের ক্রয়ক্ষমতাকে সীমিত করবে। বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণে জ্বালানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা, সেখানে এই প্রভাব আরও গভীর। কৃষকরা ইন্ধন খরচ বহন করতে পারবেন না, ফসলের দাম বেড়ে যাবে এবং ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্য অপ্রাপ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উল্লম্ফন এবং অভ্যন্তরীণ খাদ্য ও জ্বালানি নীতির দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করলে দেশ নতুন ধরনের খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। এর ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে আমাদের শ্রমিকরা কুয়েত যুদ্ধের সময়ের মতো দলে দলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফিরতে থাকলে কী পরিস্থিতি হবে, তা অনেকটা আগেভাগেই অনুমান করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক সংকট ও কৃষিতে সেচের অভাব আমাদের দেশে উচ্চ অর্থনৈতিক মন্দা সূচনা করতে পারে।
তাই নতুন সরকারকে জনকল্যাণে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় অটুট রাখার জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য মজুতের বিষয়টিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বাংলাদেশ সরকারকে মনে রাখতেই হবে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই আস্থার যথাযথ মূল্য দিতে সরকারকে সব শ্রেণি-গোষ্ঠীর মানুষের যথাযথ মর্যাদার ভিত্তিতে একটি ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ গড়ার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এ দেশের লাখ লাখ নারী শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীর সুরক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারকে অবশ্যই মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবেশ নিশ্চিত করতে আন্তরিক হতে হবে। সরকারের শুধু প্রশংসা করা গণমাধ্যমের কাজ নয়। সরকারের যে কোনো সমালোচনার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। এটা শেষ পর্যন্ত সরকারকেই সাহায্য করবে। এবারের নির্বাচনেও বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী বিরোধী দল পায়নি। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার প্রধান স্থান গণমাধ্যম। ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা, সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা গণতন্ত্রকেই কেবল সংহত করবে না বরং সরকারকেও জনপ্রিয় করবে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির মূল সেøাগান ছিলÑ সবার আগে বাংলাদেশ। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উক্তি হলোÑ ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’। এ কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে বিএনপির নেতা-কর্মীদের। মনে রাখতে হবে বিএনপি দলের সরকার নয়, জনগণের সরকার। যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে, যারা দেয়নি, সবার জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে হবে এ সরকারকে। ক্ষমতায় এসেছি তাই সবকিছু আমাদের। আমরা যা খুশি তাই করব, এ ধরনের সর্বনাশা মানসিকতা সব সময়ই ক্ষতিকর।
গবেষক ও কলামিস্ট
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post