বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাহাজ ভাঙা শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা এই শিল্প দেশের ইস্পাত চাহিদার বড় অংশ জোগান দেয়। পাশাপাশি লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর মানবিক সংকটÑ যেখানে শ্রমিকদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে, অথচ তাদের জন্য নেই ন্যূনতম নিরাপত্তা, চিকিৎসা নিশ্চয়তা কিংবা বীমা সুরক্ষা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বহু আগেই জাহাজ ভাঙা শিল্পকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবুও বাস্তবতা হলোÑ বাংলাদেশে এই খাতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকাংশই কাজ করছেন অরক্ষিত পরিবেশে। প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিসংখ্যানও এই সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শতাধিক শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও বহু শ্রমিক আহত হয়েছেন। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়Ñ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি জীবনের গল্প, যা হঠাৎ করেই থেমে গেছে বা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলোÑ এত ঝুঁকিপূর্ণ একটি খাতে এখনও বীমা সুবিধা কার্যত অনুপস্থিত। অথচ বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্টসংখ্যক শ্রমিক থাকলে বীমা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এই আইন প্রয়োগে রয়েছে বড় ধরনের শৈথিল্য। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে মালিকপক্ষ আইনগত দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান খুব জটিল নয়। গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স বা সমষ্টিগত বীমার মাধ্যমে অল্প প্রিমিয়ামে শ্রমিকদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সহজ হবে এবং মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার পাবে আর্থিক সহায়তা। তবুও এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মালিকপক্ষের অনীহা এবং সরকারের দুর্বল নজরদারি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।
এখানে প্রশ্ন আসেÑ শ্রমিকদের জীবন কি এতটাই মূল্যহীন? যে শিল্প দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, সেই শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েয়কিট বিষয়ের ওপর নজর দিতে হবে।
জাহাজ ভাঙা শিল্পে বীমা বাধ্যতামূলক করে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। অস্থায়ী নিয়োগের অপব্যবহার বন্ধ করে সব শ্রমিককে আইনের আওতায় আনতে হবে। সরকারকে সামাজিক বীমা কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে স্বল্প আয়ের শ্রমিকরাও সহজে এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। ব্যাংক ঋণ, লাইসেন্স ও রপ্তানি সুবিধার সঙ্গে শ্রমিক কল্যাণ ও বীমা সংযুক্ত করতে হবে। জাহাজ ভাঙা শিল্প শুধু অর্থনৈতিক খাত নয়Ñ এটি মানবিক দায়বদ্ধতারও একটি বড় পরীক্ষা। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে এই শিল্পের সাফল্য কখনই পূর্ণতা পাবে না। কাজেই শুধু সতর্কবার্তা নয়, বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। জাহাজ ভাঙা শিল্পে বীমা বাধ্যতামূলক করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post