তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড যখন কোনো দেশে তাদের ব্যবসা সম্প্র্রসারণ করে, তখন তারা কেবল পণ্য নিয়ে আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে তাদের তথাকথিত ‘গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড’ এবং ‘ইথিক্যাল কোড অব কন্ডাক্ট’। একটি ব্র্যান্ডের অডিটের ক্ষেত্রে একজন ইথিক্যাল অডিটর হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল সেই স্ট্যান্ডার্ডগুলো যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। কিন্তু অডিট করতে গিয়ে আমি যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা কেবল হতাশাজনক নয়, বরং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের নৈতিক দেউলিয়া হওয়ার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আমি দেখলাম, একটি লোকাল অফিস দু-তিনজন প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত ধরে চলছে একটি স্বৈরশাসিত ক্ষুদ্র রাজ্যের মতো, যেখানে কর্মীদের স্বার্থ ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়। বডি শেমিং, বুলিং ৃএবং ধর্মীয় কটাক্ষ যেখানে প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা, সেখানে কর্মীরা যে কতটা অসহায় অবস্থায় দিন যাপন করেন, তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। কিন্তু অন্ধকারের গভীরতা আরও প্রকট হলো যখন একটি প্রমাণিত যৌন হয়রানির অভিযোগ সামনে এলো।
এমন একটি যৌন হয়রানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তে বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ চিত্র। অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের একজন ‘হাই-পারফর্মিং ম্যানেজার’। আর এই ‘পারফরম্যান্স’ই যেন তাকে অপরাধ করার লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছে। তিনি ভুক্তভোগীকে উদ্দেশ করে কুরুচিপূর্ণ এবং ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ভিক্টিম যখন একটি নির্দিষ্ট রঙের স্কার্ফ পরে আসতেন, তখন তাকে উদ্দেশ করে বলা হতো, ‘আজ তোমাকে পুরো পরীর মতো লাগছে।’ আপাতদৃষ্টিতে এটি প্রশংসা মনে হলেও সেই মন্তব্যের সুর এবং ভিক্টিমের ওপর তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। এর ফলে ভিক্টিম এতটাই মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন যে, তিনি সেই নির্দিষ্ট রঙের পোশাক বা স্কার্ফ পরা পুরোপুরি বন্ধ করে দেন, যা ছিল তার এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ এবং নিজেকে অপরাধীর কুনজর থেকে বাঁচানোর চেষ্টা। এ ছাড়া সময়ে অসময়ে কাজের অজুহাতে প্রায় ২০০ বার সেই ভুক্তভোগীর হাত কিংবা শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় অপ্রত্যাশিত ও অযাচিত স্পর্শের ঘটনা ঘটেছে অহরহ।
কিন্তু বিস্ময়কর এবং লজ্জাজনক বিষয় হলো ব্র্যান্ডটির হেড অফিসের প্রতিক্রিয়া। তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর তারা অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনার বদলে অডিটরের রিপোর্টের চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করল। তারা দাবি করল, সম্প্রতি একটি টিম মিটিংয়ে তারা ভুক্তভোগীকে সেই রঙের স্কার্ফ পরতে দেখেছে। তাদের প্রশ্নÑ ‘যদি ভিক্টিম ট্রমার কারণে সেই রঙের পোশাক এড়িয়ে চলে, তবে মিটিংয়ে কেন তা পরল? বিষয়টি কি তবে অতিরঞ্জিত বা সাজানো নয়?’ অথচ ভুক্তভোগী নিজেই ইন্টারভিউয়ের সময় এসব বলেছেন, যার যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে বলা যায় যে, সেসময় সেই ব্র্যান্ডের নির্বাচিত একজন নারী অডিটর সেখানে ছিলেন।
যখন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে একজন ভিক্টিমের দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা এবং প্রমাণিত যৌন হয়রানির চেয়ে একটি নির্দিষ্ট দিনে পরা পোশাকের রঙ বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে সেই প্রতিষ্ঠানের বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। স্কার্ফের রঙ কোনোদিন অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না, কিন্তু অপরাধীর মনস্তত্ত্ব বোঝার মতো ন্যূনতম যোগ্যতা যখন ম্যানেজমেন্ট হারায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানটি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়।
এক্ষেত্রে রক্ষকের ভূমিকায় থাকার কথা সেই ব্র্যান্ডের লোকাল অফিসের এইচআর এর। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মীর শেষ ভরসার জায়গা হলো এইচআর বিভাগ। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এইচআর নিজেই হয়ে উঠেছেন অপরাধী চক্রের অন্যতম সদস্য। অডিট চলাকালে যখন জানতে চাইলাম, কেন প্রতিষ্ঠানে কোনো ‘অ্যান্টি-হ্যারেজমেন্ট পলিসি’ বা হয়রানিবিরোধী নীতিমালা নেই, তখন এইচআর অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে উত্তর দিলেনÑ‘আমাদের এখানে কখনো এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, তাই এই পলিসির প্রয়োজনই বোধ করিনি।’
কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে এলো এক নিষ্ঠুর সত্য। ভুক্তভোগী তিন বছর ধরে চলা এই ক্রমাগত যৌন হয়রানির প্রতিকার চেয়ে একই এইচআরের কাছে অন্তত ১৭ থেকে ১৮ বার গিয়েছিলেন। প্রতিবার তাকে নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়েছে এমন কথা বলে যে, ‘এই বিষয়টা নিয়ে বেশি কিছু বলো না, কারণ তার সঙ্গেই তো তোমাকে কাজ করতে হয়।’ যে এইচআর তিন বছর ধরে ১৭-১৮ বার একটি মেয়ের আর্তনাদ শুনেছেন, তিনি যখন বলেন ‘এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি,’ তখন তিনি আর নিরপেক্ষ থাকেন না। তিনি তখন সরাসরি অপরাধের অংশীদার। এই ধরনের এইচআর কর্মকর্তারা মূলত প্রতিষ্ঠানের ভেতর একটি ‘কালচার অব সাইলেন্স’ বা নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি করেন, যা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
পরে তারা ভুক্তভোগীকে না শুনে দোষী ব্যক্তি ও এইচআরের সঙ্গে বসতে চায়। এক্ষেত্রে সাদামাটা ইন্টারভিউ, একটা সতর্ক নোটিশ দেওয়ার মতো দায় সারা গোছের কিছু করাই তাদের পরিকল্পনা ছিল যা ভুক্তভোগী ও যারা বিষয়টি উত্থাপন করেছিল, তাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেবে। আমার কাছে এটি একটি প্রহসন ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। তারা অভিযুক্ত লোকাল বস এবং সেই নিষ্ক্রিয় এইচআরের সঙ্গেই সব তথ্য শেয়ার করতে চাচ্ছে। এর ফলে ভিক্টিম এবং যারা অডিটরের কাছে তথ্য দিয়েছে (হুইসেলব্লোয়ার), তাদের পরিচয় প্রকাশ্যে চলে আসবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যখন এখনো ভিক্টিমের বস হিসেবে বহাল তবিয়তে আছেন, তখন তার সঙ্গে ভিক্টিমকে ‘জাস্টিফিকেশন’-এর নামে মুখোমুখি করা আসলে দ্বিতীয়বার হয়রানি করার শামিল।
একে করপোরেট ভাষায় বলা হয় ‘কনস্ট্রাক্টিভ ডিসচার্জ’। অর্থাৎ সরাসরি বের না করে দিয়ে কর্মস্থলকে এতটাই বিষাক্ত এবং অনিরাপদ করে তোলা, যাতে ভিক্টিম ও সত্য বলা কর্মীরা নিজে থেকেই চাকরি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচেন। এটি একটি সুপরিকল্পিত অপরাধমূলক কৌশল।
অপরাধ চাপা দেওয়ার পর যে তার চড়া মূল্য দিতে হয়, এটা প্রমাণিত। যেসব গ্লোবাল ব্র্যান্ড তাদের অভ্যন্তরীণ পচনকে ‘পারফরম্যান্স’ বা অন্য কোনো তুচ্ছ কারণ দিয়ে আড়াল করতে চেয়েছে, তারা দীর্ঘ মেয়াদে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৮ সালে গুগলের ২০ হাজার কর্মী একযোগে রাজপথে নেমে এসেছিল, কারণ কর্তৃপক্ষ একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার যৌন হয়রানি ধামাচাপা দিয়েছিল। গুগলের ব্র্যান্ড ইমেজ আজীবন সেই কলঙ্ক বয়ে বেড়াবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ হয়রানি উপেক্ষা করার ফলে উবার কেবল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যই হারায়নি, তাদের সিইও’কেও ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছিল।
ব্র্যান্ডটি তাদের লোকাল অফিসের দু-তিনজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে রক্ষা করতে গিয়ে আসলে নিজেদের ব্র্যান্ডের ‘এথিক্যাল সুইসাইড’ বা নৈতিক আত্মহত্যা ঘটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন এই খবর ছড়াবে যে, তারা যৌন হয়রানির প্রমাণের চেয়ে ভিক্টিমের পোশাকের রংকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন তাদের কোনো বিজ্ঞাপনী প্রচারণা এই দাগ মুছতে পারবে না।
যৌন হয়রানি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত সমস্যা, যা কেবল তখনই নির্মূল সম্ভব, যখন প্রতিষ্ঠানটি অপরাধীকে প্রটেক্ট করা বন্ধ করবে। সাদা স্কার্ফ পরা বা না পরা কোনোদিন যৌন হয়রানির চেয়ে বড় ইস্যু হতে পারে না। এইচআরের ১৭-১৮ বারের অবহেলা এবং মিথ্যাচার কেবল একটি মেয়ের জীবন নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আজ মুখ বন্ধ করা যাবে, কিন্তু সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না।
একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কাছে কর্মীরা নিরাপত্তা এবং মর্যাদা আশা করে, পোশাকের রঙের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত রিপোর্টকে নস্যাৎ করা নয়। এই ধরনের করপোরেট মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা উচিত। বিচার যখন স্কার্ফের রঙে আটকে যায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানটি আর কর্মস্থল থাকে না, তা হয়ে ওঠে অপরাধীদের অভয়ারণ্য। আজ যারা নীরব আছেন বা অপরাধীকে আশ্রয় দিচ্ছেন, তাদের মনে রাখা উচিতÑঅবিচার যেখানে স্বাভাবিক ঘটনা, সেখানে একদিন সবাইকেই এর মূল্য দিতে হবে।
কলামিস্ট ও মানবসম্পদ প্রশিক্ষক
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post