নিজস্ব প্রতিবেদক: পতনের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। দুই মাস পর পুঁজিবাজারে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ১ হাজার ২২২ কোটি ৩০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছিল। সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে গতকাল বুধবার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অধিকাংশ শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে।
এতে ডিএসইর সবগুলো মূল্যসূচকও বেড়েছে। একইসঙ্গে ঢাকার এই পুঁজিবাজারে দুই মাসের বেশি সময় পর এক হাজার কোটি টাকার ঘরে লেনদেন হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় লেনদেন শুরু ৃহয় অধিকাংশ শেয়ার ও ইউনিটের দরবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। এই দরবৃদ্ধি দিনভর অব্যাহত থাকে। শুরুর বড় উত্থান অবশ্য দিনশেষে কিছুটা কমেছে।
দিনশেষে ডিএসইতে মোট ৩৯১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া সিকিউরিটিজগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ২১৩টির, বিপরীতে ১২১টির দর কমেছে। আর ৫৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
অধিকাংশ শেয়ার ও ইউনিটের দরবৃদ্ধি হওয়ায় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২৯৯ পয়েন্টে উঠেছে। এছাড়া শরিয়াহ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস ৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৬৬ পয়েন্টে এবং বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ২০ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এদিন ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৫৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে (মঙ্গলবার) লেনদেন হয়েছিল ৯২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ দিনের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ১২৭ কোটি ৭ লাখ টাকা। ডিএসইর আজকের লেনদেন গত ১৭ ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। ওইদিন ঢাকার এই পুঁজিবাজারে ১ হাজার ২২২ কোটি ৩০ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়।
লেনদেনের ভিত্তিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলোÑসিটি ব্যাংক, ডমিনেজ স্টিল, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, একমি পেস্টিসাইডস, মুন্ন্নু ফেব্রিকস, খান ব্রাদার্স পিপি, তৌফিকা ফুডস, অগ্নি সিস্টেমস, সিমটেক্স এবং পিপলস ইন্স্যুরেন্স।
দাম বৃদ্ধির শীর্ষে থাকা ১০ কোম্পানি হলোÑদেশ গার্মেন্টস, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সমতা লেদার, বিডিল্যাম্পস, বঙ্গজ লিমিটেড, রূপালী ব্যাংক, অগ্নি০সিস্টেমস, মুন্নু ফেব্রিকস, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং এবং মীর আখতার।
অন্যদিকে দরপতনের শীর্ষে থাকা ১০ কোম্পানি হলোÑশেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, নাহি অ্যালুমিনিয়াম, আইসিবি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড-১, স্কিম-১, গোল্ডেন সন, রিজেন্ট টেক্সটাইলস, প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, মেট্রো স্পিনিং, সায়হাম কটন, বিএইচএফসি এবং বিডি থাই ফুড।
অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬০ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৭৯৭ পয়েন্টে উঠেছে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৩০ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের মধ্যে ১১০টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৯১টির এবং ২৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ১৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৩৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা।এ বিষয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম. হেলাল আহম্মেদ খান শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে দুই মাস পর লেনদেন বৃদ্ধির যে কথা বলা হচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক খবর। আমরা এটাকে অবশ্যই পজিটিভ হিসেবে দেখতে চাই। তবে পাশাপাশি দেখতে হবে, আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত সাধারণ বিনিয়োগকারী বা গ্রাহকদের কাছে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পরীলক্ষিত হয়নি। বিশেষ করে ব্যাংক রেজুলেশন আইন যেভাবে পাস করা হয়েছে, সেটার কারণে আর্থিক খাত নিয়ে মানুষের মধ্যে আবারও অস্থিরতা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি পর্যন্ত যে পরিমাণ ডিপোজিট ছিল, ফেব্রুয়ারিতে তা একসঙ্গে অনেকটাই নেমে এসেছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে আর্থিক খাত নিয়ে বড় ধরনের সংশয় ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অনেক জায়গায় বলা হচ্ছে, এই অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে। সার্বিকভাবে বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলো নিয়ে মানুষের কাছে এখনও খুব বেশি ইতিবাচক বার্তা যাচ্ছে না। মানুষ মনে করেছিল, নির্বাচিত সরকার আসার পর দেশ একটি স্থিতিশীল অবস্থায় যাবে, অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে এবং অন্যান্য সূচকও ভালোভাবে চলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, গত এক-দুই মাসে সরকারের পদক্ষেপে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন মানুষ এখনও দেখেনি। সেই জায়গা থেকে মানুষের মধ্যে হতাশা ও আস্থাহীনতা রয়ে গেছে। পুঁজিবাজার নিয়েও আগের মতো শঙ্কা এখনও আছে। মানুষ আবারও ভাবছে, নির্বাচিত সরকার আসার কারণে পুঁজিবাজারে আগের মতোই কিছু গোষ্ঠী তৈরি হবে কি না, যেমন অতীতে সালমান এফ রহমানদের সময় যেভাবে বাজার লুটপাট হয়েছিল। সাধারণ আমানতকারী, গ্রাহক এবং যারা পুঁজিবাজারের লেনদেনের সঙ্গে জড়িত, তাদের মধ্যে এই শঙ্কা এখনও প্রবল।
এই অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, সে জন্য সরকারের উচিত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া; যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসে। শুধু কথা নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে সরকার সত্যিই এগোচ্ছে। একই সঙ্গে সংস্কারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে এবং দলীয় বিবেচনায় নয়, বরং অভিজ্ঞ, দক্ষ ও ক্লিন ইমেজের বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দিতে হবে। তাহলেই পুঁজিবাজারে আবারও আস্থা ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post