নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: চামড়াশিল্পের সংকট কাটাতে সরকার আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। ঈদ সামনে রেখে পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে শৃঙ্খলা আনতেও নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিবছরই চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়া, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সংরক্ষণ সংকট নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা কাটাতেই এবার আগাম প্রস্তুতি ও কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের জন্য এখনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেনি সরকার।
এ ছাড়া এই খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ নীতিতে বড় ধরনের শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ৫ মে জারি করা এক বিশেষ সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে চামড়া ব্যবসায়ীরা আগের ঋণের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ ছাড়াই নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সচল রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব ব্যবসায়ীর ঋণ পুনঃতফসিল বা রিশিডিউল করা রয়েছে, তাদের নতুন ঋণ পেতে আগের বকেয়ার নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ বিশেষ সুবিধা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, চামড়াশিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। যেহেতু এ খাতের প্রধান কাঁচামাল কোরবানির ঈদকে ঘিরেই সংগ্রহ করা হয়, তাই এ সময়ে ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চলতি মূলধন ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবারের নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র সংগ্রাহকদের ওপর। যাতে ঋণ সুবিধা শুধু বড় শিল্পপতি বা ট্যানারি মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য হাটবাজার ও গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকগুলোকে ২০২৬ সালের জন্য চামড়া খাতেপ্রথম পৃষ্ঠার পর
ঋণ বিতরণের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা কোনোভাবেই গত বছরের তুলনায় কম রাখা যাবে না। ঋণের লক্ষ্যমাত্রা এবং তার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হওয়া রোধ হবে এবং মাঠ পর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার ন্যায্য দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গত ৬ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, চামড়াশিল্পের উন্নতি অগ্রগতির বিষয়ে সরকার বেশকিছু সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প হাতে নিয়েছে। চামড়ার বাজার সৃষ্টি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় চামড়া শিল্পের হারানো গৌরবকে পুনরুদ্ধারে আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবো। কোরবানির চামড়ার ন্যায্য মূল্যপাওয়ার ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। ইনশাল্লাহ স্বল্প সময়ের মধ্যে সফলতা আসবে বলেও বাণিজ্যমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে কোরবানির পশুর চামড়া যাতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা যায়, সেজন্য দেশের মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর অনুকূলে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
এই বরাদ্দের বড় অংশ দিয়ে লবণ কিনে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসকেরা তাদের জেলার সব মাদরাসা ও এতিমখানায় কোরবানির আগেই এই লবণ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকবেন। পাশাপাশি যথাযথ নিয়মে পশু জবাই ও চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে জেলা-উপজেলায় প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করা হবে।
গত ৪ মে অর্থমন্ত্রণালয় শর্ত সাপেক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে এই অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছেÑমাদরাসা ও এতিমখানায় বিনা মূল্যে লবণ বিতরণ করতে হবে এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে লবণের প্রাপ্যতা নির্ধারণ ও পরিবহনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
এ ছাড়া দেশব্যাপী পশুর চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং সঠিক নিয়মে পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর বিষয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাণীর চামড়া দীর্ঘক্ষণ ভালো রাখতে এবং পচন রোধ করতে সঠিক পরিমাণে লবণ ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। যথাযথভাবে লবণ ব্যবহার না করার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। বাংলাদেশে কোরবানির পশুর চামড়া সাধারণত কোরবানিদাতারা মাদরাসা ও এতিমখানায় দান করে দেন। কিন্তু চামড়ার বিশেষ দাম না পাওয়ায় চামড়া সংরক্ষণের জন্য মাদরাসা বা এতিমখানার পক্ষ থেকে টাকা খরচ করে লবণ কেনা হয় না। এতে অনেক মূল্যবান চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।
লবণের পরিমাপ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ট্যানারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিটি মাঝারি থেকে বড় আকারের গরুর চামড়া সংরক্ষণে সাত থেকে আট কেজি লবণ লাগে। কোনো কোনো গরুর চামড়ায় ১০ কেজি পর্যন্ত লবণের প্রয়োজন হয়। আর প্রতিটি ছাগল বা ভেড়ার চামড়া সংরক্ষণে তিন থেকে চার কেজি লবণ প্রয়োজন হয়।
গত ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদের পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ওই বছর ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছিল। এর মধ্যে গরু-মহিষ কোরবানি হয়েছিল ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি। ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি এবং অন্যান্য (উট, দুম্বা ইত্যাদি) ৯৬০টি প্রাণী কোরবানি হয়েছিল।
গত ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে কোরবানির পশুর চাহিদা নিরূপণ ও সরবরাহ বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, আসন্ন কোরবানিতে দেশে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর চাহিদা রয়েছে।
অন্যদিকে চামড়াশিল্পের সংকট কাটাতে সরকার এ ধরনের উদ্যোগের সাধুবাদ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এবিষয়ে এবিএস ট্যানারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমাম হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, বকেয়া পরিশোধ ছাড়াই যে নতুন ঋণ পাবেন চামড়া ব্যবসায়ীরা, এটা অবশ্যই সরকারের ভালো উদ্যোগ। তবে অনেকে সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করেও নতুন ঋণ পাচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়া দরকার।
আরাফাত লেদার কমপ্লেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনির হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, বকেয়া পরিশোধ ছাড়াই যে চামড়া ব্যবসায়ীরা নতুন ঋণ পাবেন। এইটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। আর চামড়া ব্যবসায়ীদের চাহিদা পূরণ করছে সরকার। আমরা খুব আশাবাদী, চামড়াশিল্পের সুদিন ফিরবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কোরবানির চামড়া নষ্ট হয়। ট্যানারি মালিকদের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) জানিয়েছে, গত ২০২৫ সালে কোরবানির ঈদের প্রথম দুদিনে সংরক্ষণের অভাবে সারা দেশে প্রায় পাঁচ লাখ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়েছিল।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post