মনিরুল হক: বর্তমান সময়ে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হলেও স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও অনেকটাই অসচেতন। ব্যস্ত জীবন, ফাস্টফুডের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক অভ্যাসের কারণে আমরা অনেক সময় বুঝে না বুঝেই এমন খাবার খাচ্ছি, যা ধীরে ধীরে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। অথচ সুস্থ জীবনযাপন, কর্মক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিংশ শতাব্দীর ৭০ ও ৮০-র দশকে বাংলাদেশে অধিকাংশ মৃত্যুর কারণ ছিল সংক্রামক রোগ; এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ডায়রিয়ায়। সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ইত্যাদির ফলে সংক্রামক রোগে মৃত্যু ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অন্যদিকে বাড়তে থাকে অসংক্রামক রোগে মৃত্যু। ১৯৮৬ সালে যেখানে অসংক্রামক রোগে মৃত্যু ছিল ৮%; ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯% এবং ২০১৬ সালে ৬৭%; এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে, প্রায় ১৫%। মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ছিল ক্যান্সার। অন্যান্য কারণের মধ্যে ধূমপান, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “কী খাবেন” প্রশ্নের উত্তর যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি “কেন খাবেন” সেটিও বোঝা প্রয়োজন। কারণ ‘‘পাকস্থলী মানুষের প্রথম মস্তিস্ক” এই বক্তব্য কাব্যিক মনে হলেও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। কারণ মস্তিষ্কের অনেক সিদ্ধান্তই পাকস্থলী–উদ্ভুত সিগনালের উপর নির্ভর করে। আমরা নিজেকে যতই “বুদ্ধিমান প্রাইমেট” ভাবি না কেন, আমাদের প্রতিটি দিন শুরু হয় পাকস্থলীর ক্ষুধার সংকেতে এবং শেষ হয় তার ক্লান্ত ঘড়ির নির্দেশে। এমনকি প্রেম, ভয়, উত্তেজনা সবই পাকস্থলীতে chemical footprint রেখে যায়, যেভাবে আকাশে মেঘ হাওয়া রেখে যায়। তাই প্রতিটি খাবারেরই শরীরে নির্দিষ্ট প্রভাব রয়েছে। আমরা যা খাই, সেটিই আমাদের শরীর, শক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
বর্তমানে শিশু থেকে শুরু করে তরুণদের মধ্যেও কোমল পানীয়, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, প্রসেসড ফুড এবং অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। এসব খাবার স্বাদে আকর্ষণীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা এবং লিভারের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে শহুরে জীবনে নিয়মিত বাইরের খাবার খাওয়ার অভ্যাস অনেকের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব উন্নত দেশে দিন দিন বাড়ছে। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, ডাল, দুধ, ডিম এবং আঁশযুক্ত খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও শক্তি জোগায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সুষম খাবার নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তবে শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খেলেই হবে না, খাবারের পরিমাণ ও সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেন। দুই ক্ষেত্রেই শরীরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নিয়মিত ও পরিমিত খাবার শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ধরনের খাদ্যপ্রবণতা জনপ্রিয় হচ্ছে। কেউ দ্রুত ওজন কমানোর জন্য হঠাৎ খাবার বন্ধ করে দিচ্ছেন, কেউ আবার অস্বাস্থ্যকর ডায়েট অনুসরণ করছেন। চিকিৎসকদের মতে, শরীরের প্রয়োজন বুঝে সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য সচেতনতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপদ খাবার। বাজারে ভেজাল ও রাসায়নিক মেশানো খাদ্যপণ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে মানুষ অনেক সময় পুষ্টিকর খাবার খেলেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকে। তাই খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে কঠোর নজরদারিও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ থাকতে হলে আমাদের স্থানীয় ও মৌসুমি খাবারের প্রতি গুরুত্ব বাড়াতে হবে। দেশীয় ফল, শাকসবজি এবং প্রাকৃতিক খাবার শুধু পুষ্টিকরই নয়, তুলনামূলকভাবে নিরাপদও। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়, এটি সরাসরি আমাদের স্বাস্থ্য, জীবনযাপন এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। তাই কী খাবেন এবং কেন খাবেন—এই সচেতনতা তৈরি হওয়া এখন সময়ের দাবি। সুস্থ শরীর ও সুন্দর জীবনের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই।
https://sharebiz.net/কেন-খাবেন/
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post