মানুষের জন্য গণমাধ্যম হলো সমাজের দর্পণ, যা তথ্য সরবরাহ, জনমত গঠন, শিক্ষা ও বিনোদনের মাধ্যমে জনস্বার্থ নিশ্চিত করে। এটি নিরপেক্ষভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংগতি তুলে ধরে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে জনগণকে সঠিক তথ্য জানানো এবং অধিকার রক্ষায় সহায়তা করা।
উদারুল হক হীরা: বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্প গত দুই দশকে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে, তার অন্যতম হলো মার্কেটিং ব্যবস্থার আমূল রূপান্তর। ২০০০ সালের সংবাদপত্রের মার্কেটিং আর বর্তমান সময়ের সংবাদপত্রের মার্কেটিংয়ের মধ্যে পার্থক্য শুধু কৌশলে নয়, বরং চিন্তা, প্রযুক্তি, বাজেট, পাঠকের মনস্তত্ত্ব এবং ব্যবসায়িক বাস্তবতায়ও। একসময় সংবাদপত্রের মার্কেটিং মানেই ছিল বিজ্ঞাপন সংগ্রহ এবং সার্কুলেশন বাড়ানো, হকার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা । আর এখন সংবাদপত্রের মার্কেটিং মানে হলো ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল উপস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব তৈরি, পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা এবং অনলাইন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা।
২০০০ সালের দিকে সংবাদপত্র ছিল মূলত প্রিন্টনির্ভর একটি শিল্প। তখন একটি পত্রিকার শক্তি নির্ধারণ হতো তার বিক্রির পরিমাণ দিয়ে। কোন পত্রিকা কত কপি ছাপছে, কোন এলাকায় বেশি বিক্রি হচ্ছে, কোন পত্রিকার হকার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী—এসবই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে সেই সময়ের মার্কেটিং বিভাগ পুরোপুরি মাঠকেন্দ্রিক ছিল।
তখন ভোররাতে প্রেস থেকে পত্রিকা বের হওয়ার পর সেটি দ্রুত বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা থাকত। অনেক পত্রিকার নিজস্ব গাড়ি ছিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চের মাধ্যমেও পত্রিকা পাঠানো হতো। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এজেন্ট নিয়োগ ছিল মার্কেটিংয়ের বড় অংশ। কোনো এলাকায় বিক্রি কমে গেলে মার্কেটিং কর্মকর্তারা সরাসরি সেখানে যেতেন। হকারদের সঙ্গে কথা বলতেন, স্টলে বসে পাঠকের চাহিদা বুঝতেন।
সেই সময় সংবাদপত্রের প্রচারণার বড় মাধ্যম ছিল পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড এবং বিশেষ সংখ্যা। ঈদ, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবস উপলক্ষে বড় বড় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হতো। এসব সংখ্যা বাজারে আনতে বিশেষ প্রচারণাও চালানো হতো। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ব্যানার টানানো কিংবা হকারদের অতিরিক্ত কমিশন দেওয়াই ছিল উল্লেখযোগ্য মার্কেটিং কৌশল।
২০০০ সালের মার্কেটিংয়ের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল “সম্পর্কভিত্তিক ব্যবসা”। বিজ্ঞাপন সংগ্রহের জন্য মার্কেটিং কর্মকর্তারা সরাসরি করপোরেট অফিসে যেতেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা হতো। কারণ তখন বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল সংবাদপত্র। টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এত শক্তিশালী না হওয়ায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পত্রিকাতেই সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন দিতো।
তখন সংবাদপত্রের মার্কেটিং বাজেটও বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক কম ছিল। একটি জাতীয় দৈনিকের পুরো মাসের মার্কেটিং বাজেট যেখানে কয়েক লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, সেখানে এখন বড় সংবাদমাধ্যমগুলো শুধু ডিজিটাল প্রচারণার পেছনেই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। ২০০০ সালের দিকে মার্কেটিংয়ের বড় ব্যয় ছিল পরিবহন, পোস্টার, ব্যানার, স্টল প্রচারণা এবং হকার কমিশন। কিন্তু এখন খরচের বড় অংশ চলে যাচ্ছে অনলাইন বিজ্ঞাপন, ভিডিও কনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্র্যান্ডিংয়ে।
বর্তমান সময়ের সংবাদপত্রের মার্কেটিং পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন সংবাদপত্র শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল এবং লাইভ আপডেটনির্ভর একটি পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। ফলে মার্কেটিং কৌশলও হয়ে উঠেছে ডিজিটালকেন্দ্রিক।
আগে একটি সংবাদপত্রের সফলতা নির্ভর করত কত কপি বিক্রি হচ্ছে তার ওপর। এখন সফলতা নির্ভর করছে কত মানুষ অনলাইনে দেখছে, কত মানুষ শেয়ার করছে, কতজন ভিডিও দেখছে এবং কত দ্রুত খবর ভাইরাল হচ্ছে তার ওপর। ফলে সংবাদপত্রের মার্কেটিং এখন শুধুই বিক্রিনির্ভর নয়, বরং “মনোযোগনির্ভর” হয়ে গেছে।
বর্তমানে একটি সংবাদ প্রকাশের পর সেটিকে ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও, শর্ট ক্লিপ, ইনফোগ্রাফিক এবং ইউটিউব কনটেন্টে রূপান্তর করা হয়। কারণ এখন মানুষ শুধু পড়তে চায় না, দেখতে চায়, শুনতেও চায়। তাই মার্কেটিং বিভাগকে এখন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
বর্তমান সময়ের সংবাদপত্রের মার্কেটিং বাজেট কেন এত বেড়েছে, তার পেছনেও রয়েছে বড় কারণ। এখন একটি সংবাদমাধ্যমকে প্রতিদিন কোটি মানুষের স্ক্রিনে নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখতে হয়। এজন্য ফেসবুক বুস্টিং, গুগল বিজ্ঞাপন, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, ভিডিও প্রমোশন, মোবাইল অ্যাপ মার্কেটিং এবং ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
একসময় যেখানে একটি পত্রিকার প্রচারণা মানেই ছিল ব্যানার আর পোস্টার, সেখানে এখন একটি ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের পেছনেই লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়। বড় সংবাদমাধ্যমগুলো এখন আলাদা ডিজিটাল মার্কেটিং টিম গড়ে তুলেছে। সেখানে কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট, ডেটা বিশ্লেষক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞ এবং ভিডিও মার্কেটিং কর্মীরা কাজ করছেন।
বর্তমানে মার্কেটিং বিভাগ শুধু বিজ্ঞাপন আনার কাজ করে না। তারা পাঠকের আচরণ বিশ্লেষণও করে। কোন খবর বেশি পড়া হচ্ছে, কোন ভিডিও বেশি দেখা হচ্ছে, কোন সময়ে মানুষ বেশি সক্রিয়—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কনটেন্ট পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ মার্কেটিং এখন সম্পূর্ণ ডেটানির্ভর।
সংবাদপত্রের মান উন্নয়নেও মার্কেটিংয়ের ভূমিকা অনেক বড়। কারণ একটি ভালো সংবাদ তৈরি করলেই হবে না, সেটি মানুষের কাছে পৌঁছাতেও হবে। আগে ভালো রিপোর্ট নিজে থেকেই পাঠকের কাছে পৌঁছে যেত। এখন তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়ে একটি ভালো সংবাদকেও আলাদা করে তুলে ধরতে হয়। আর এই কাজটাই করছে মার্কেটিং বিভাগ।
বর্তমানে সম্পাদকীয় বিভাগ এবং মার্কেটিং বিভাগের মধ্যে আগের চেয়ে অনেক বেশি সমন্বয় তৈরি হয়েছে। কোন বিষয় নিয়ে পাঠকের আগ্রহ বেশি, কোন ধরনের সংবাদ বেশি আলোচিত হচ্ছে, কোন বিষয় ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি—এসব বিষয়ও এখন সংবাদ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে।
তবে এই পরিবর্তনের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার কারণে অনেক সংবাদমাধ্যম এখন “ক্লিকবেইজ” শিরোনামের দিকে ঝুঁকছে। অর্থাৎ এমন শিরোনাম ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মানুষকে ক্লিক করতে বাধ্য করে, কিন্তু অনেক সময় ভেতরের সংবাদ সেই মানের হয় না। ফলে স্বল্পমেয়াদে পাঠক বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কেটিং অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটি যেন সাংবাদিকতার মূল নীতিকে দুর্বল না করে। কারণ শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। প্রযুক্তি মানুষকে একটি সংবাদে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই পাঠককে ধরে রাখতে পারে কেবল মানসম্মত সাংবাদিকতা।
সংবাদপত্রে মার্কেটিংয়ের আরেকটি বড় ভূমিকা হলো ব্র্যান্ড তৈরি করা। আগে মানুষ শুধু পত্রিকা পড়ত। এখন মানুষ একটি সংবাদমাধ্যমের “পরিচয়” অনুসরণ করে। কোন পত্রিকা কত দ্রুত খবর দেয়, কোন পত্রিকার ভিডিও ভালো, কোন পত্রিকার বিশ্লেষণ শক্তিশালী—এসবই এখন ব্র্যান্ডের অংশ।
বর্তমানে সংবাদপত্র শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিজ্ঞাপন বাজারে পরিবর্তন। আগে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিত। এখন সেই বিজ্ঞাপনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। ফলে সংবাদপত্রগুলোকে নতুন ব্যবসায়িক মডেলে যেতে হচ্ছে।
কেউ ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন চালু করছে, কেউ ভিডিওভিত্তিক কনটেন্ট বাড়াচ্ছে, কেউ আবার ইভেন্ট, টকশো বা ব্র্যান্ডিং ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ সংবাদপত্র এখন শুধু খবরের কাগজ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
তবে এত পরিবর্তনের পরও একটি বিষয় স্পষ্ট—সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মানসম্মত সাংবাদিকতা ও আধুনিক মার্কেটিংয়ের ভারসাম্যের ওপর। শুধু ভালো কনটেন্ট দিয়ে টিকে থাকা কঠিন, আবার শুধু মার্কেটিং দিয়েও দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, সংবাদপত্রের মার্কেটিংয়ের এই দুই যুগ আসলে বাংলাদেশের গণমাধ্যম শিল্পের বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। ২০০০ সালের সীমিত বাজেটের মাঠকেন্দ্রিক প্রচারণা থেকে আজকের কোটি টাকার ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং—এই যাত্রা শুধু ব্যবসায়িক পরিবর্তন নয়, এটি প্রযুক্তি, সমাজ এবং মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনেরও গল্প। বর্তমান সময়ে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন বাজেটের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া ও সি এস আর খাতে। যার ফলশ্রুতিতে দিনের পর দিন সংবাদপত্র শিল্প রুগ্ন ও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post