নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুত করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য থেকেই বড় বাজেটের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করে। বৈঠকে বাজেটের মূল অগ্রাধিকার, সম্ভাব্য রাজস্ব কাঠামো, উন্নয়ন ব্যয় এবং সামাজিক খাতে বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা হয়। সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বাজেটের মূল কাঠামোতে সম্মতি দিয়েছেন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সরকারের পরিকল্পনায় এবার ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে মূলধারার অর্থনীতির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, সংস্কৃতি, ডিজিটাল কনটেন্ট, মিডিয়া, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের কার্যক্রমকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করে বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈঠকে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে এ খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয় এবং প্রধানমন্ত্রীও এতে ইতিবাচক মত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। কোরবানি ঈদের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এবার বাজেটের বড় অংশই সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির দিকে যাবে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, আগামী বাজেটে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও বৃদ্ধি করা হতে পারে। বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, প্রতিবন্ধীভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তামূলক কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছর থেকেই সামাজিক সুরক্ষা খাত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগামী অর্থবছরে আরও সুসংগঠিত রূপ পাবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করা হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধেও ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধেই প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, যা সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে এডিপির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআই আয়োজিত পরামর্শক কমিটির বৈঠকে তিনি বলেন, বাজেট বড় না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না এবং উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া কাক্সিক্ষত জিডিপি প্রবৃদ্ধিও অর্জন সম্ভব নয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারকে একদিকে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর শর্ত ও প্রত্যাশাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। ফলে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাজস্ব আহরণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার, খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রি (ওএমএস) এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার চিন্তা রয়েছে।
সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করতে চাইলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস তুলনামূলক কম। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের আশপাশে থাকতে পারে।
এদিকে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার আয়োজিত এক প্রাক্-বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আগামী বাজেটে নতুন করে করহার বাড়ানো হবে না। তবে করের আওতা ও কর আদায়ের ভিত্তি বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে কর ও করবহির্ভূতÑউভয় ধরনের রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হবে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে দেশে কর অব্যাহতির সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এসআরও-নির্ভর কর অব্যাহতি ব্যবস্থাই রাজস্ব খাতের অন্যতম বড় সমস্যা।
মো. আবদুর রহমান খান বলেন, আগামী বাজেটে করের আওতা বাড়াতে বেশ কিছু নতুন খাত অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে রাজস্ব নীতিতে বাণিজ্য সহজীকরণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ যাতে দ্রব্যমূল্যের চাপে কিছুটা স্বস্তি পায়, সে বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বকারী হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে তিনটি বড় সংকট রয়েছেÑরাজস্ব ঘাটতি, কর ফাঁকি এবং হয়রানি। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরেই রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকছে এবং কর ফাঁকি এখন একটি পদ্ধতিগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তিনি রাজস্ব কাঠামোয় ধাপে ধাপে নির্ভরযোগ্য সংস্কার আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, দেশের বর্তমান করব্যবস্থা অনেকটাই পুরোনো কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৯০-এর দশকের সংস্কারের সুফল দীর্ঘদিন পাওয়া গেলেও গত দুই দশকে বড় ধরনের কর সংস্কার হয়নি। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে করের হার বাড়িয়ে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ সীমিত। বরং অনেক ক্ষেত্রে করের হার কমানো অর্থনীতির জন্য সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে বাণিজ্য করের ক্ষেত্রে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে কর-জিডিপি ভারসাম্য সংকট এবং ঋণের ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও জাতীয় ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার ছিল শিক্ষা খাত। কিন্তু বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধই সরকারের অন্যতম বড় ব্যয় খাতে পরিণত হয়েছে।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বিদ্যমান করব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা সবসময় হয়রানির আশঙ্কায় থাকেন। তার মতে, যারা নিয়মিত কর দেন, তাদেরই আবার কর না দেওয়া ব্যক্তিদের দায়ও বহন করতে হয়। তিনি করজাল বাড়ানোর পরিবর্তে করের ভিত্তি সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন।
দেশে কর ও ভ্যাটের সব নিয়ম আছে। কিন্তু কতজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে তা মেনে চলছেন, সেই প্রশ্ন তোলেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান। তিনি বলেন, কতজন মানুষ শুল্ক, কর, সম্পূরক শুল্কের নিয়ম মেনে চলছেন? এ ক্ষেত্রে আমাদের তদারকি কোথায়? অথচ এখানেই রাজস্বের মূল অপচয় বা লিকেজ হচ্ছে। ফলে আমরা যারা নিয়ম মেনে চলছি, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছি। এনবিআর সুগার ট্যাক্সের (চিনিযুক্ত পণ্যের ওপর কর) কথা বলছে। তবে বিভিন্ন দেশ যে সুগার ট্যাক্স গ্রহণ করেছে, আমরা যদি সেটি বিবেচনা করতাম, তবে খুব ভালো হতো।
এ ছাড়া বিকেএমইর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক করকাঠামোর জটিলতা কমানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত রপ্তানিতে যে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া হয়, তার ওপর আবার আয়কর আরোপ করা হয়, যা উদ্যোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করছে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post