এফ আই মাসউদ: বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া দিন দিন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। বংশগত এই রক্তরোগে আক্রান্ত রোগী ও বাহকের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাব, বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা না করা এবং থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সীমিত ধারণার কারণে দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জš§ নিচ্ছে। চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই এ রোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক, যা মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রতিবছর দেশে ৬ থেকে ৮ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জš§গ্রহণ করে। বর্তমানে দেশে এ রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬৫ থেকে ৮০ হাজার। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ বলছে, বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম থ্যালাসেমিয়া প্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক এবং প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জš§গ্রহণ করে। ‘অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেস’-এ প্রকাশিত বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) এক রিভিউ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ১০ দশমিক ৯ থেকে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে। অর্থাৎ দেশে প্রায় ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ২ কোটি মানুষ এই রোগের বাহক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া একটি জš§গত বা জেনেটিক রক্তরোগ। এ রোগে শরীর পর্যাপ্ত বা স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার প্রধান উপাদান, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পরিবহন করে। হিমোগ্লোবিন তৈরিতে আলফা ও বিটা গ্লোবিন চেইন কাজ করে, যা নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট জিন। এই জিনগুলোর একটি বাবা এবং অন্যটি মায়ের কাছ থেকে আসে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যদি একটি জিনে ত্রুটি থাকে, তাহলে ব্যক্তি থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা ক্যারিয়ার হন। আর বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকে ত্রুটিযুক্ত জিন এলে শিশু থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগে আক্রান্ত হয়। তখন শিশুর শরীরে মারাত্মক রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। কিছু রোগীর অবস্থা তুলনামূলক কম গুরুতর হলে তাকে থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমেডিয়া বলা হয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি
দেখা যায় হিমোগ্লোবিন-ই (এইচবি-ই) এবং হিমোগ্লোবিন-বিটা (এইচবি-বিটা) থ্যালাসেমিয়া। জাতীয় থ্যালাসেমিয়া জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, দেশে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ মানুষ এইচবি-ই এবং ২ দশমিক ১২ শতাংশ মানুষ এইচবি-বিটা থ্যালাসেমিয়ার বাহক।
বিভাগভিত্তিক জরিপে দেখা গেছে, রংপুর বিভাগে থ্যালাসেমিয়ার বাহকের হার সবচেয়ে বেশি, ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী, সেখানে হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম, যেখানে ১১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। এছাড়া ময়মনসিংহে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, খুলনা ও ঢাকায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, বরিশালে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সিলেটে সবচেয়ে কম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এ রোগের বাহক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা ও মা উভয়েই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাহলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ২৫ শতাংশ। এছাড়া ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তান বাহক হতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারগুলো আগে থেকে এ বিষয়ে জানে না, ফলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং থ্যালাসেমিয়া বিশেষজ্ঞ রোমেনা আলম শেয়ার বিজকে বলেন, থ্যালাসেমিয়া কোনো সংক্রামক রোগ নয়; এটি সম্পূর্ণভাবে জেনেটিক বা বংশগত। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, একজন বাহক যদি এমন কাউকে বিয়ে করেন, যিনি বাহক নন, তাহলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। এজন্য বিয়ের আগে উভয়ের রক্ত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমান বলেন, শিশুর জšে§র এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই সাধারণত থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। শিশুর শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ওজন না বাড়া, ঘন ঘন সংক্রমণ, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ এবং পেট ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তিনি জানান, সিবিসি টেস্ট, রক্তে হিমোগ্লোবিন বিশ্লেষণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার বাহক শনাক্ত করা সম্ভব। তার মতে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ অনেক সহজ। এজন্য বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের মতে, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসা মূলত দুই ধরনেরÑসাপোর্টিভ এবং নিরাময়মূলক। সাপোর্টিভ চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন, আয়রন চিলেশন থেরাপি এবং ওষুধের মাধ্যমে রক্তস্বল্পতা নিয়ন্ত্রণ। নিয়মিত রক্ত গ্রহণের ফলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে যায়, যা লিভার, হার্ট ও হরমোন গ্রন্থির ক্ষতি করতে পারে। এজন্য আয়রন চিলেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে হাইড্রক্সিইউরিয়া ও থ্যালিডোমাইড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কিছুটা বাড়ানো হয়। উন্নত দেশগুলোতে ১৮ বছরের বেশি বয়সি রোগীদের জন্য লুসপ্যাটারসেপ্ট ইনজেকশন ব্যবহƒত হলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাংলাদেশে এখনো সহজলভ্য নয়।
থ্যালাসেমিয়ার একমাত্র নিরাময়মূলক চিকিৎসা হলো বোনম্যারো বা স্টেমসেল ট্রান্সপ্লান্ট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুর জšে§র এক থেকে দুই বছরের মধ্যে ট্রান্সপ্লান্ট করা গেলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তবে উচ্চ ব্যয়, উপযুক্ত দাতার অভাব এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এ চিকিৎসা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনজুর মোরশেদ শেয়ার বিজকে বলেন, দেশে থ্যালাসেমিয়া শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাব্যবস্থায় এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অধিকাংশ চিকিৎসাসেবা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় দূরবর্তী এলাকার রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, রক্তের সংকট থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশগুলোতে অধিকাংশ রক্ত স্বেচ্ছায় দান করা হলেও বাংলাদেশে এখনো স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার কম। ফলে রোগীদের স্বজন বা পেশাদার রক্তদাতাদের ওপর নির্ভর করতে হয়।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেছেন, থ্যালাসেমিয়ার সবচেয়ে বড় সমাধান হলো প্রতিরোধ। অনেক দেশে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো আমরা জানি না কারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো গাইডলাইন প্রয়োজন। তবে সামাজিক কুসংস্কার ও অজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা।
তিনি আরও বলেন, দেশে ৬৪টি জেলা ও অনেক উপজেলায় এখন রক্ত পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা ও উদ্যোগ।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post