ক্রিসেন্টের মজুত চামড়া নষ্ট হওয়ার পথে

১৯৭৭ সালে ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের মাধ্যমে পথচলা শুরু ক্রিসেন্ট গ্রুপের। বর্তমানে ছয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে গ্রুপটিতে। পারিবারিক এ গ্রুপের পরিচালনায় রয়েছেন দুই ভাই এমএ কাদের ও এমএ আজিজ। যদিও ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থপাচারের অভিযোগে বর্তমানে কারাগারে আছেন এমএ কাদের। এতে থমকে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম। সরেজমিন প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান তথ্য নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক প্রতিবেদন। আজ ছাপা হচ্ছে তৃতীয় পর্ব

শেখ আবু তালেব: ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ধুঁকছে ক্রিসেন্ট ট্যানারি। সাভারের ট্যানারি পল্লিতে ক্রিসেন্ট ট্যানারির কারখানা নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় তাদের মজুত রাখা কাঁচা চামড়া নষ্ট হতে চলেছে। এছাড়া সাভারে কর্মরতরা চার মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। তাই এরই মধ্যে ছাঁটাই করা হয়েছে ৭০-৮০ কর্মীকে। বেতন ছাড়া ছুটি দেওয়া হয়েছে প্রায় ২০ জনকে। গত ঈদুল ফিতরের আগে বোনাস দিলেও বেতন এখনও বকেয়া রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কবে চালু হবে তার নিশ্চয়তা না পেয়ে অনেকেই বিকল্প চাকরি খুঁজছেন। সরেজমিনে জানা গেছে এসব তথ্য।
দেখা গেছে, সাভারের ট্যানারি পল্লিতে ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের জন্য নির্মাণাধীন ভবনটির কাজ এখনও শেষ হয়নি। ভবনটির দ্বিতীয় তলার ছাদ নির্মাণ করা হলেও কোনো সীমানা দেয়াল তৈরি করা হয়নি। দ্বিতীয় তলার পুরোটাই ফাঁকা। বাইরের দেয়ালে থাকা সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘নির্মাণাধীন ক্রিসেন্ট ট্যানারি’।
ঋণের অর্থ আদায়ে রাষ্ট্রীয় জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনসার নিয়োগ করা হয়েছে ক্রিসেন্ট ট্যানারিতে। প্রতিষ্ঠানটি পাহারা ও পণ্যদ্রব্য যাতে সরিয়ে নিতে না পারে, এজন্য ব্যাংক এসব উদ্যোগ নিয়েছে। গ্রুপটির অর্থ পাচারের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে। পরবর্তীকালে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রয়োজনীয় জামানত রাখা হয়েছে। এছাড়া ট্যানারিতে চামড়া মজুত করা আছে। ওই চামড়া থেকে পণ্য উৎপাদন করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি এবং বিদেশে রফতানি করতে পারলে অর্থ আদায় সম্ভব।
ব্যাংক সূত্র জানায়, যে পরিমাণ চামড়া মজুত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য বের করা হয়নি। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে বোঝাতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনসার নিয়োগ করা হয়েছে। আনসার নিয়োগ করে বন্ধকি সম্পত্তি নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে জনতা ব্যাংক। বর্তমানে ক্রিসেন্ট গ্রুপের সবগুলো প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকায় তার ভাইদের প্রতিষ্ঠানেও আনসার নিয়োগ করা হয়েছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, মজুত করা চামড়ার পরিমাণ কমে আসছে। কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে কিছুদিন পরপর চামড়া সংরক্ষণ করতে কেমিক্যাল মিশিয়ে ধুয়ে প্রক্রিয়াজাত করে রাখা হচ্ছে চামড়া। আগে যেখানে ১৪টি ড্রাম চলত, সেখানে বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি ড্রাম চলছে। বড় আকারের ড্রামগুলো সচল রাখতে একেকদিন একেকটি চালাচ্ছেন কর্মীরা।
এ সময় কথা হয় ক্রিসেন্ট ট্যানারির এক কর্মীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার দুই মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। বেতন কম হলেও কোম্পানি আমাদের বেতন কখনোই বাকি রাখেনি। এজন্য এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। কিন্তু এখন মালিকের সমস্যা হওয়ায় বেতন আটকে গেছে। আমাদের বলা হয়েছে, ঈদের আগেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাই অপেক্ষা করছি।
বর্তমানে ট্যানারির মেশিনারিজ নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতেই ১৫-২০ জন কর্মী রাখা হয়েছে। বাকিদের ছুটি ও ছাঁটাই করা হয়েছে। ছুটিতে থাকা এক কর্মীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ১৫ দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ট্যানারিতে তেমন কোনো কাজ নেই; তাই গ্রামের বাড়ি চলে এসেছি। কাজ না থাকায় ছুটি বেশি নিয়েছি।
ছুটির সময়ে বেতন দেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, আমাদের ১৫ দিন পরপর বেতন দেওয়া হয়। হাজিরাভিত্তিক এসব বেতন। কাজ করলে টাকা, না করলে কোনো বেতন নেই। বর্তমানে কিছু শ্রমিককে রাখা হয়েছে, তারা ট্যানারিতেই থাকেন দিনের বেলা। টুকটাক কাজ হয়; কিন্তু চামড়া বের করতে না পারলে নষ্ট হয়ে যাবে।
তিন বছর ধরে কাজ করছেন এমন এক কর্মী জানান, আমরা মূল কোম্পানির পক্ষ থেকে বেতন পাই। ট্যানারি আমাদের বেতন দেয় না। কিন্তু আমাদের বেতনও তিন মাস ধরে আটকে আছে। সমস্যা সমাধান হওয়ার কথা বলা হচ্ছে কোম্পানির পক্ষ থেকে, তাই অপেক্ষায় আছি।
সূত্র জানিয়েছে, বেতন দেওয়ার ভয়ে ক্রিসেন্ট ট্যানারিতে যান না কোম্পানির কর্মকর্তারা। দুজনকে এ বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়া আছে; কিন্তু তারা মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসেন মাত্র।
এ বিষয়ে ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হাজারীবাগে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। অফিসে উপস্থিত থাকা অন্যরা জানান, মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা নুরুল ইসলাম মাঝে মাঝে অফিসে আসেন। কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি অফিসে আসেন না। কর্মকর্তারা আসেন অনিয়মিতভাবে। এজন্য কারও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির নামে ১৭৪ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের কাছে। সে ঋণ পরিশোধ না করায় খেলাপি হয়েছে। খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬৩ কোটি টাকায়। ঋণ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদের বর্তমানে কারাগারে। তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই ব্যবসায়িক কার্যক্রম থমকে গেছে ক্রিসেন্ট ট্যানারির। পাওনা অর্থ আদায়ে সাভারের ট্যানারিতে আনসার বসিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ফলে ট্যানারি থেকে কোনো ধরনের পণ্য বাইরে বের হচ্ছে না। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম থমকে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চামড়া এখন রফতানি করা যাচ্ছে না।
১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পারিবারিক এ কোম্পানিটি সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছিল। চামড়াশিল্প জগতে একটি অবস্থান করে নিয়েছিল তারা। কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয় ঢাকার হাজারীবাগে। সরকারের উদ্যোগে হাজারীবাগের সব ট্যানারি সাভারের বিসিক চামড়াশিল্প নগরীতে স্থানান্তর করা হয়। এরই অংশ হিসেবে ক্রিসেন্ট ট্যানারিও সাভারে শিল্প প্লট পায়।