জাহিদুল ইসলাম : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে ইন্টারনেট আজ সবার দোরগোড়ায়। বর্তমানে বিশ্বকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনেছে ইন্টারনেট। এর বদৌলতে আজ মানুষ অনেক অসাধ্যকে সাধন করতে সক্ষম হয়েছে। মানুষের জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কার্যাদি সম্পাদনের ক্ষেত্রে এটা অপরিসীম ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির কারণে ইন্টারনেট আমাদের সামনে আজ অসীম তথ্যভান্ডারের দ্বার উšে§াচন করেছে, যোগাযোগব্যবস্থাকে করেছে সহজতর। প্রযুক্তির সহযোগিতায় জীবন হয়ে উঠেছে আরও সুশৃঙ্খল। সুতরাং ইতিবাচকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারলে জীবনই বদলে যাবে। কারণ গুগল থেকে এত কিছু শেখা যায় যে বলে শেষ করা যাবে না। একজন মানুষ যা জানতে চায়, তার প্রায় সবই খুঁজে পাওয়া যায় ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে। এভাবে ইন্টারনেট যেন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কখনও কল্পনাও করেনি যে কম্পিউটারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা করা যেতে পারে। আর এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে ইন্টারনেট। তথ্যপ্রযুক্তির আবির্ভাবের সঙ্গে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ এটিকে তাদের পণ্য এবং পরিষেবার প্রচারের জন্য একটি দুর্দান্ত প্ল্যাটফর্ম হিসাবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই ইন্টারনেটে আসক্তিই আমাদের সমূহ পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আগামীর জন্য ভাবনার কারণ হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির সহায়তায় ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও অপব্যবহার তরুণ প্রজš§কে দিন দিন বিপথগামিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা রূপ নিচ্ছে নিদারুণ এক ভয়াবহতায়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বর্তমানে প্রয়োজনীয় খবরের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় খবর আর গুজবও ছড়াচ্ছে। এর ফলে এই ইন্টারনেটে আসক্তিই একদিন হয়তো আমাদের জীবনটাকে অত্যন্ত দুঃখময় ও বিবর্ণ বানিয়ে ছাড়বে। এদিকে ইন্টারনেট ব্যবহারের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ সহজ করা, তথ্য ও জ্ঞানের ভান্ডার প্রাপ্তি, শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনসহ আরও অনেক কিছু। ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানুষের সঙ্গে দ্রুত ও সহজে যোগাযোগ স্থাপন করার পাশাপাশি যেকোনো বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়, যার ফলে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম সহজ ও উন্নত হয়। ইন্টারনেটের এসব ইতিবাচক ব্যবহার মানবজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এটা আমাদের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক দিক। ভবিষ্যতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুফল পেতে হলে এর ব্যবহার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পরিচালনা করতে হবে। একদিকে ইন্টারনেটের যৌক্তিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা সমাজব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারি। পাশাপাশি অন্যদিকে এর অযৌক্তিক ব্যবহার মানবজীবনে নানা ধরনের ক্ষতিসাধন করে। ইন্টারনেট আসক্তির কালো থাবা সমাজের সর্বত্রই বিরাজমান। এর ফলে শিশু-কিশোররা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি বয়স্করাও এর ভয়াবহ প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এখন শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই যার যার প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন ইন্টারনেটকে মাধ্যম করে। ইন্টারনেটের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কম্পিউটার, মোবাইলের এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস ডিভাইস নিয়ে বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করছেন। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের বদৌলতে কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিকস ডিভাইস আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষের মধ্যে এখন প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষ ইন্টারনেটের সুবিধা পেয়ে আসছে। ফলে ইন্টারনেট ব্যবহার করা কেবল আমাদের অভ্যাসই নয়, বরং পরিণত হয়েছে একটি আসক্তিতে। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটের অপব্যবহারের কারণে মানুষ আজ অনেকটা হুমকির মুখে। একদিকে ইন্টারনেটের যেমন সুফল আছে, তেমনি রয়েছে কুফলও। বর্তমানে আমরা সবাই ইন্টারনেট ব্যবহারের এই উভয় বিষয়েই কমবেশি অবগত। সুতরাং এর কুফলটা বর্তমান সময়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়, সেদিকে আমাদের বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। আমরা স্বাধীনতা চাই। কিন্তু আবার অতিরিক্ত স্বাধীনতা আমাদের অন্যায় করতে উদ্বুদ্ধ করে। মূলত ভার্চুয়াল জগৎকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে ইন্টারনেটের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি। এ কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। অপরদিকে ভবিষ্যতে ইন্টারনেটের ইতিবাচক ব্যবহার বাড়াতে হলে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সুস্থ যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার ওপর জোর দিতে হবে। এর পাশাপাশি ডিজিটাল বিভেদ কমানো, তথ্যের সঠিক ব্যবহার শেখানো এবং ক্ষতিকারক কনটেন্ট মোকাবিলা করার জন্য সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। ইন্টারনেটের ইতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো মানুষ তার জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। তবে নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেট এই সমাজকে ও জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতনতার উদ্যোগ নিতে হবে। ইন্টারনেট যোগাযোগমাধ্যমের এক অদৃশ্য জালে পৃথিবীকে একত্র করে রেখেছে। সুতরাং এই ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রিত ও পরিমার্জিত ব্যবহারই পারে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের বিশ্ব গড়ে তুলতে। ইন্টারনেট ব্যবহারে নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং ডিজিটাল নৈতিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক না করা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং ভুয়া খবর ও সাইবার বুলিং থেকে দূরে থাকা উচিত। আমাদের সবার প্রত্যাশা এটাই যে ইন্টারনেট আমাদের সার্বিক জীবনে অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ হয়ে উঠুক। আর তাই ইন্টারনেট আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, ইচ্ছা, চেষ্টা ও পারস্পরিক সহযোগিতা। ইন্টারনেটের ইতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল)
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post