নিজস্ব প্রতিবেদক : সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এ বছর দেশের বাজারে ইলিশ মাছের দাম অনেক বেশি। দেশেই প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হওয়া ইলিশের দাম কেন এত বেশি, সেই প্রশ্ন অনেকেরই মনে। সাম্প্রতিক এক সরকারি সমীক্ষায় ইলিশের দাম বাড়ার পেছনে ১১টি কারণ উঠে এসেছে। ফলে ইলিশ এখন অনেকের কাছেই বিলাসী পণ্য।
এক কেজি ওজনের একেকটা ইলিশ মাছ কিনতে লাগে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশের কেজিও এখন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ ইলিশের ৬০ শতাংশের উৎস সমুদ্র, বাকি ৪০ শতাংশ আসে নদী ও মোহনা থেকে।
ইলিশের দাম বাড়ার কারণ নিয়ে সম্প্রতি সমীক্ষা চালিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে ইলিশের দাম বৃদ্ধির পেছনে ১১ কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলোÑচাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা; অবৈধ মজুত ও মুনাফাখোর সিন্ডিকেট; জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি; মাছ ধরার খরচ বৃদ্ধি; নদীর নাব্য সংকট ও পরিবেশগত সমস্যা; অবৈধ জালের ব্যবহার; দাদন প্রথার প্রচলন; বিকল্প কর্মসংস্থান; নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা; মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও রপ্তানির চাপ।
অভিযোগ রয়েছে, অধিক লাভের আশায় চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন ব্যবসায়ীরা। এজন্য তারা ইলিশের অবৈধ মজুত গড়ে তোলেন বলেও ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি বাণিজ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠিয়েছে কমিশন। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের আগস্টে দেড় কেজি বা তারও বেশি ওজনের প্রতি কেজি ইলিশের দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ৭৫০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের কেজি ছিল ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা, ৫০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ছিল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে আকৃতিভেদে তিন হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ বিক্রি হলেও এ বছর ভারতে প্রতি কেজি ইলিশের রপ্তানি মূল্য ১ হাজার ৫৩৩ টাকা।
এদিকে সরকার-নির্ধারিত রপ্তানি মূল্যের চেয়ে দেশের বাজারে ইলিশের দাম অনেক বেশি হওয়ায় অনুমতি পেয়েও রপ্তানিতে অনীহা ইলিশ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর।
ট্যারিফ কমিশন তাদের প্রতিবেদনে সরাসরি পাইকার বা আড়তদারদের কাছে মাছ বিক্রির জন্য জেলেদের সমবায় সমিতি গঠন করার সুপারিশ করেছে। সরবরাহ চেইনের ধাপ কমানোর জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি, ন্যায্য দামে ইলিশ বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রধান শহরগুলোয় সরকারি উদ্যোগে ইলিশের বিশেষ বিপণন কেন্দ স্থাপন, কোল্ডস্টোরেজ তৈরি, আড়তদার ও পাইকারদের বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স, সরবরাহ ব্যবস্থার ধাপ অনুযায়ী যৌক্তিক মুনাফা বেঁধে দেয়ার পাশাপাশি দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ দেয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।
এ বিষয়ে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল খান বলেন, ‘সরেজমিন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইলিশ মাছ প্রায় শতভাগ দেশীয় পণ্য হলেও বাজারে এর দামের পেছনে কৃত্রিমতার সংযোগ রয়েছে। ইলিশ আহরণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা ডলারের ওঠানামার তেমন প্রভাব নেই। সমীক্ষায় চিহ্নিত মূল জায়গা হলো আহরণ পরবর্তী সময়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা স্তর ও তাদের অতিরিক্ত মুনাফা।’
মইনুল খান জানান, মূলত দাদন ব্যবসায়ীদের কারসাজি এর পেছনে বেশি ভূমিকা রাখছে। সমীক্ষায় এসব স্তর কমানোর উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি দাদন ব্যবসায়ীদের মনিটরিংয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কমিশনের সুপারিশে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে, খরচ বিশ্লেষণ করে আকৃতি অনুযায়ী ইলিশের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে। এতে ইলিশের প্রান্তিক বিক্রেতা ন্যায্য দাম পাবে, অন্যদিকে ভোক্তাদের কাছে তা নির্ধারিত দামে বিক্রি হবে মনে করে কমিশন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশই ইলিশ। দেশের জিডিপিতে এটি প্রায় এক শতাংশ অবদান রাখে। বাংলাদেশের জেলেরা বছরে ছয় লাখ টন ইলিশ ধরেন। এই মাছের বেশিরভাগই আসে সমুদ্র থেকে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেছেন, চাষের মাছ উৎপাদন করার পরও ৪০০ টাকায় একটা ভালো মাছ কেনা যাচ্ছে, অথচ ইলিশ উৎপাদনে কোনও খরচ নেই। তাহলে ইলিশের বর্তমান দাম কোনোভাবেই যৌক্তিক না এবং ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন। বাঙালির যে শখের ইলিশ সেই ইলিশের স্বাদ বাঙালি ভুলে গেছে সিন্ডিকেট ও দাদন চক্রের কারণে। তাদেরকে ভাঙাই হলো আমাদের প্রথম দায়িত্ব।
এদিকে গতকাল চাঁদপুরে শেষ মুহূর্তে ইলিশের চড়া দাম ছিল। ইলিশের প্রজনন রক্ষায় শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে পদ্মা-মেঘনায় সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। ঠিক তার আগে চাঁদপুরের মাছঘাটগুলোয় চড়া দামে বিক্রি হয় ইলিশ।
এর আগে অনেক জেলে মাছ ধরা বন্ধ করলেও বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত কিছু জেলে মাছ ধরে চাঁদপুর মাছ ঘাটে নিয়ে আসেন। এসব ইলিশ চড়া দামে বিক্রি করা হয় বলে জানিয়েছেন চাঁদপুর মাছ ঘাটের ইলি ক্রেতা ও বিক্রেতারা।
শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ইলিশ কিনতে আসা ক্রেতাদের ভিড়। তবে শেষ মুহূতে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয় ২ হাজার ৫০০ টাকায়, এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। আর এক কেজির নিচে ৭০০-৮০০ গ্রাম ২ হাজার ২০০ টাকায়, পাঁচ-ছয়শ গ্রামের ১ হাজার ৬০০ টাকায় এবং তিন-চারশ গ্রামের ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়। গতকাল মাত্র ১০০ মণ মাছ সরবরাহ হয়েছে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মাছ কম থাকায় দামে বেশি মনে করচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন।
চাঁদপুর শহরের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, ইলিশের দাম বাংলাদেশে আকাশচুম্বী। দেশের মানুষের যেই পরিমাণ আয় তার তুলনায় অনুযায়ী ইলিশের দাম বেশি। তাই তাদের ইলিশ খাওয়া সম্ভব নয়।
হাজীগঞ্জ থেকে আসা ক্রেতা সফিকুর রহমান বলেন, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। যে কারণে এই ঘাটে ইলিশের দরদাম দেখার জন্য আসছি। তবে মাছের চাইতে ক্রেতার সংখ্যাই বেশি। মাছের দাম বেশি।
মেসার্স আলম এন্টারপ্রাইজের মালিক নূরে আলম বলেন, আজকে শেষ দিন। আমরা মনে করেছিলাম আজ প্রচুর ইলিশ আসবে। কিন্তু সেই পরিমাণ ইলিশ আসেনি। চাহিদা অনুযায়ী ক্রেতা বেশি, তাই দামও বেশি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post