নিজস্ব প্রতিবেদক : কর্মস্থলের নিয়মনীতি লঙ্ঘন এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০০ কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ব্যাংকটি ৪ হাজার ৯৭১ জনকে ওএসডি (অন সার্ভিস ডিউটি) করে। কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ছয় দাবিতে আগামীকাল রোববার থেকে লাগাতার কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন ইসলামী ব্যাংক থেকে ওএসডি হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে গতকাল শুক্রবার এই ঘোষণা দেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে তারা চাকরিচ্যুতদের স্বপদে পুনর্বহাল, ওএসডি প্রত্যাহার, শর্ত আরোপ করে অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট নেয়া বন্ধ এবং পানিশমেন্ট ট্রান্সপার বন্ধসহ ছয় দাবি তুলে ধরেন। এছাড়া চাকরিচ্যুত এবং ওএসডি হওয়া কর্মকর্তারা তাদের নানা দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের থাকার কথা ছিল ব্যাংকে। অথচ আজ রাজপথে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রহসনমূলক পরীক্ষার আয়োজন করে ৪০০ জনকে ছাঁটাই এবং পাঁচ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ওএসডি করেছে।
সাড়ে পাঁচ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঘরে চরম মানবিক বিপর্যয় চলছে দাবি করে এই ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, এর মধ্যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কর্মীদের অফিস আইডি এবং ব্যক্তিগত স্যালারি আইডি বন্ধ করে দিয়েছে। এ মুহূর্তে বাড়ি ভাড়া দেওয়া, বাবা-মায়ের ওষুধ কেনা বা বাজার করার মতো টাকা আমাদের হাতে নেই।
সবাইকে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা হুমায়ুন মোক্তার রশীদ বলেন, পরিবার নির্ভর করে আমাদের বেতনের ওপর। আমরা বেতন পাচ্ছি না, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে রেখেছে। সবাই মানবেতর জীবনযাপনের দিকে যাচ্ছি। আপনারা আমাদের পাশে দাঁড়ান। এই বিপর্যয়ে এগিয়ে আসেন।
আরেক ব্যাংক কর্মকর্তা আশরাফুল হক বলেন, চাকরির আট বছর পর এসে মূল্যায়ন পরীক্ষা আয়োজনের নামে প্রহসনের পরীক্ষা বয়কট করার কারণে ওএসডি ও চাকরিচ্যুত করা হয়। ব্যাংকের পরীক্ষার মতো ওএসডি এবং চাকরিচ্যুতের নোটিশও অবৈধ। তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ বা চাকরিচ্যুতের কারণ উল্লেখ করেনি।
তারা বলেন, আগামী রোববার থেকে আমরা কর্মবিরতিতে যাব। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে। এ সময় রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতিসহ দেশের সব রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাংককর্মীদের পাশে থাকার অনুরোধ জানানো হয়। সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ তৈরি করে সবাইকে কর্মস্থলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবিও করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর বিপুলসংখ্যক কর্মী সরাসরি সিভি নিয়ে নিয়োগ পান, যেখানে কোনো লিখিত পরীক্ষা হয়নি। নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় অংশই ছিলেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা। ফলে বর্তমানে ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ওই অঞ্চল থেকে আগত।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, এস আলম গ্রুপের সময়ে অযোগ্য লোকজনকে নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটিকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এখন আমরা ব্যাংকের স্বার্থে সবাইকে যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং হাইকোর্টের নির্দেশনার ভিত্তিতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর এই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ৫ হাজার ৩৮৫ কর্মকর্তাকে বলা হলেও মাত্র ৪১৪ জন অংশ নেন। যারা উপস্থিত হননি, সেই ৪ হাজার ৯৭১ জনকে পরদিন থেকেই ওএসডি করা হয়। এছাড়া পরীক্ষার আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়ানো ও প্রকাশ্যে বিরোধিতা করায় ২০০ কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
ওএসডি হওয়া কর্মীদের অভিযোগ, তারা হাইকোর্টে রিট করার পর আদালত নিয়মিত প্রমোশনাল পরীক্ষা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেই আদেশ অমান্য করে আলাদা যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করে, যা বেআইনি। তারা আবার আদালতের আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ইসলামী ব্যাংক একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কর্মীদের দক্ষতা যাচাইয়ের অধিকার রাখে, কারণ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মক্ষমতা কর্মীদের যোগ্যতা ও দক্ষতার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। তারপরও একাংশ কর্মকর্তা পরীক্ষা বর্জন করেন এবং বিক্ষোভ মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্যে এ ধরনের পরীক্ষা দেশে এই প্রথম। সাধারণত পদোন্নতির জন্য ভাইভা নেয়া হয়, তবে এখানে কর্মীদের মান যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন অভিজ্ঞতা। তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই নিয়োগ বা কর্মী যাচাই তাদের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় হলেও তা করতে হবে দেশের প্রচলিত আইন ও নীতিমালার আওতায় থেকে।
২০১৭ সালে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা তুলে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যাংকটি গভীর আর্থিক সংকটে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রদবদল এনে এস আলমের প্রভাব দূর করার পদক্ষেপ নেয়।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post