শেয়ার বিজ ডেস্ক : দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ সংরক্ষণে আজ বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। প্রতিবছরের মতো এবারও প্রজনন মৌসুমে ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা বাজারে ইলিশের সরবরাহ, দাম ও জেলেদের জীবিকাÑসবকিছুর ওপরই সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশিত হওয়ার পরপরই রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরের বাজারে ইলিশের দাম কিছুটা বেড়েছে। কারওয়ান বাজারে গত সপ্তাহে এক কেজি মাঝারি আকারের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল প্রায় ৯৫০ থেকে এক হাজার টাকা। বড় সাইজের ইলিশ এখন ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ মুহূর্তে ক্রেতাদের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দাম বেশ কিছুটা চড়া।
তবে রাজধানী বর্তমানে ফাঁকা থাকায় ঢাকার বাজারে ভিড় তুলনামূলকভাবে কম। ফলে এখানে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়নি। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। গ্রামের মানুষ উৎসব ও পারিবারিক আয়োজনের জন্য শেষ সুযোগে ইলিশ কিনতে ছুটছেন। মফস্বল শহরের বাজারগুলোতে তাই দাম আরও কিছুটা বেশি।
নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা মাছ ধরতে পারবেন না। সরকার তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় প্রতি জেলেকে ৪০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বাস্তবতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।
প্রজনন রক্ষার এ ২২ দিন অভয়াশ্রম এলাকায় মাছ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুত নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার করলে মৎস্য আইনে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
চাঁদপুরের জেলে আবুল কাসেম কালু অভিযোগ করেন, ‘সরকার চাল দেয় ঠিকই, কিন্তু আমাদের নাম লিস্টে অনেক সময় থাকে না। আবার অনেকেই অর্ধেক চাল পায়।’ অনেক জেলে পরিবার বলছে, প্রকৃত জেলেরা প্রায়ই বঞ্চিত হন, আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ভুয়া নাম তালিকায় ঢুকে যায়।
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে প্রতিবছর ভারতসহ কয়েকটি দেশে সীমিত পরিমাণে ইলিশ রপ্তানি করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার বাংলাদেশ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি করেছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বাড়ার আরেকটি কারণ তৈরি হয়েছে। যদিও সরকার দাবি করছে, রপ্তানি সীমিত এবং দেশের বাজারে প্রভাব তেমন পড়বে না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানির কারণে অন্তত বড় আকারের ইলিশের ঘাটতি চোখে পড়ছে।
ঢাকার কাওরানবাজারের মাছ বিক্রেতা আব্দুল রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞার আগে মানুষ এখন বেশি করে কিনছে। দাম একটু বেড়েছে। তবে বাজারে খুব ভিড় নেই, কারণ ঢাকায় মানুষ কম। গত বছর নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু এ বছর উৎসব, রপ্তানি ও আগাম চাহিদার কারণে দাম বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছের সরবরাহ আবার বাড়লে দাম স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ড. মো. মোতালেব হোসেন জানিয়েছেন, আমরা সবদিক বিবেচনা করে প্রতিটি জেলেকে ২২ দিন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে সবাইকে ৪০ কেজি করে চাল দিয়েছি।
ইলিশ প্রজননের মৌসুমে এই নিষেধাজ্ঞা না দিলে ভবিষ্যতে ইলিশের সংখ্যা কমে যাবে। প্রতিবছর এ উদ্যোগের ফলেই দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। ২০০৮ সালে যেখানে উৎপাদন ছিল ২ লাখ মেট্রিক টন, এখন তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টনের বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনীয়। কিন্তু একই সঙ্গে জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ৪০ কেজি চাল যথেষ্ট। কিন্তু তাদের সবাইকে কিছু নগদ অর্থ সহায়তাও দেয়া উচিত।
ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য ইলিশ সংরক্ষণ করা জরুরি। তবে একইসঙ্গে বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ, সঠিকভাবে চাল বিতরণ ও প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বাজারে দাম সাময়িকভাবে বেশি হলেও নিষেধাজ্ঞা শেষে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই ইলিশ আবার ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post