চট্টগ্রাম ব্যুরো: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে দ্বিতীয় ইউনিট বসানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। ইউনিটটি পুরোপুরি চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ হবে। প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী মে মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। এছাড়া দেশে এপ্রিল ও মে মাসের জ্বালানি পুরোপুরি মজুত আছে। পাশাপাশি জুন মাসের জ্বালানি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, নতুন ইউনিটের কার্যক্রম ২০২৯ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি দেশীয় অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা সম্প্রসারণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সরকারের বর্তমান মেয়াদের ভেতরেই প্রকল্পটির কাজ দৃশ্যমান পর্যায়ে নিয়ে আসাই আমাদের লক্ষ্য। ইউনিটটি চালু হলে তা স্থানীয়ভাবে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনে দেশের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে এবং জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ সহজতর করবে। এটি বাংলাদেশকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে আরও অনেক দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ করে দেবে, যার ফলে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক সংকটের ঝুঁকি হ্রাস পাবে। প্রস্তাবিত দ্বিতীয় ইউনিটের (ইআরএল-২) বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা হবে প্রায় ৩০ লাখ টন, যা বর্তমান স্থাপনার সক্ষমতার দ্বিগুণ। এটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
এক দশকেরও বেশি সময় আগে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সরকার এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। তবে অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নগত জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বারবার দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ে। নতুন করে নেওয়া এই তৎপরতা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়ার নতুন প্রচেষ্টারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড কোম্পানি বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার। ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম শহরের প্রান্তে কর্ণফুলী নদীর তীরে ১৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা প্রারম্ভিক ব্যয়ের মাধ্যমে এ পরিশোধনাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৮ সাল থেকে পরিশোধন কেন্দ্রটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠনটি তাদের নিজস্ব পরিশোধন ইউনিটের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল শোধন করে। এই শোধনাগারে আরও রয়েছে ক্রুড
অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট ইউনিট, এসফল্টিক বিটুমিন প্ল্যান্ট, ভিসব্রেকার ইউনিট, ক্যাটালাইটিক রিফরমিং ইউনিট ও কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট। এটি ২০১৫ সালে সেরা সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সংগ্রহ করা হয়, যা বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে।
প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান অস্থিরতা মার্চ ও এপ্রিল মাসে তেলের চালানে প্রভাব ফেলেছে। তবে এই পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং ওই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল আরও অনেক দেশকেই একই ধরনের চাপের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানির মজুত সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুত রয়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আমদানিকৃত সব জ্বালানি দেশে এসেছে, এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা মেটানোর পূর্ণ সক্ষমতা আছে এবং জুন মাসের চাহিদা মাথায় রেখে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার কাজও চলমান রয়েছে। বিশেষ করে জেট ফুয়েলের মজুত প্রায় ছয় সপ্তাহের জন্য পর্যাপ্ত।
লোডশেডিং প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে কৃষি ও শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, ফলে গৃহস্থালি খাতে তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। তবে মে মাসে ফসল সংগ্রহ শুরু হলে গৃহস্থালি খাতকে আবারও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই স্বল্প সময়ের অসুবিধা দেশের সার্থে সবারই মান উচিত।
এদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত জানান, বর্তমানে উৎপাদন কিছুটা ধীরগতিতে চলছে এবং দুটি প্ল্যান্ট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পেট্রোল ও বিটুমিন উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী একটি জাহাজ চলতি মাসের শেষের দিকে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিদর্শনকালে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম এবং যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ১৫ এপ্রিল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, দেশে অকটেন ও পেট্রোলের মজুত যা আছে, তা দিয়ে আগামী দুই মাসেও কোনো সমস্যা হবে না। বর্তমানে দেশে ডিজেল রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১ টন এবং ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post