নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : ব্যাংকঋণের সুদ হার কমাতে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) টানা তিনবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। তারা অনড় অবস্থানে রয়েছে। বিএবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে উচ্চ সুদহারে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে। তাদের যুক্তি ১৫ শতাংশ হারে সুদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে শিল্পখাত দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ সুদহার বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের পথে অচলাবস্থা তৈরি করেছে। উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প নিতে সাহস পাচ্ছেন না আর যারা আগেই ঋণ নিয়েছেন, তারা খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বর্তমান ১৫ শতাংশ সুদের হার আমাদের ব্যবসার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুদের এই উচ্চহার অব্যাহত থাকলে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসায় আসতে নিরুৎসাহিত হবেন, আর পুরোনো ব্যবসায়ীরাও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহ হারাবেন। এতে সামগ্রিকভাবে দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে।’
মুনাফার পরিমাণও ক্রমেই কমে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকঋণের চাপ ব্যবসায়ীদের নাজুক অবস্থায় ফেলছে। এভাবে চলতে থাকলে ক্ষুদ্র থেকে বড়Ñসব ধরনের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, দ্রুত সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হোক। এতে ব্যবসায়ীরা নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবেন, বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্ত ভিত্তি পাবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সুদের হার কমিয়ে আনা।
শিল্পোদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৫ শতাংশ সুদ এখন একটি অকার্যকর কাঠামো। এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে, কর্মসংস্থান সীমিত হয়ে আসছে। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে শিল্পখাত স্থবির হয়ে যাবে।’ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের এ প্রতিনিধি বলেন, ‘আমাদের মতো ছোট ব্যবসার পক্ষে এ হার দেয়া অসম্ভব। এত বেশি সুদের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের শর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। আইএমএফ সুদহার কমানোর বিপক্ষে। কারণ এতে মুদ্রাস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ সুদই আসলে অর্থনীতিকে প্রাণহীন করছে। বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন বাড়বে না, কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।
একদিকে আইএমএফের শর্ত মানা বাধ্যতামূলক, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ক্রমবর্ধমান চাপ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই দ্বন্দ্ব কাটাতে হলে একটি সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। ধাপে ধাপে সুদহার সামঞ্জস্য করার পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ, যেমন বাজার তদারকি জোরদার করা ও আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুতই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোগ নেবে। না হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রবাহ আরও সংকুচিত হয়ে অর্থনীতিকে অচল করে দিতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া অবশ্য ভিন্ন। গভর্নরের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে উচ্চ সুদহার বজায় রাখা অপরিহার্য। আইএমএফ স্পষ্টভাবে বলেছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদহার কমানো যাবে না। তাই ব্যবসায়ীদের অনুরোধ সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
এদিকে অন্তবর্তীকালীন সরকারও একই অবস্থান নিয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তত সরকার তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। কিন্তু সরকারের এক শীর্ষ নীতিনির্ধারক বলেন, ‘এই মুহূর্তে সুদহার কমানো মানে অর্থনীতির স্থিতি নষ্ট করা। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও বেড়ে যাবে।’ ফলে ব্যবসায়ীরা আবারও হতাশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তালিকায় দেখা যায়, বড় ও মাঝারি শিল্প খাতে ঋণের সুদহার বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ১৩ দশমিক ৫০ থেকে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশের মধ্যে ঘুরছে। গড়ে ব্যাংকগুলোর স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ শতাংশের কাছাকাছি; যা উদ্যোক্তাদের মতে অযৌক্তিকভাবে বেশি।
জানা গেছে, বাংলাদেশের তুলনায় এশিয়ার অন্যান্য দেশে সুদহার অনেক কম। ভারতে গড় ঋণের সুদ ৯ দশমিক ৭৭ শতাংশের মতো। শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে গিয়ে সুদহার সাময়িকভাবে বাড়ালেও এখন ধাপে ধাপে নামিয়ে আনছে ১২ শতাংশের নিচে। ফলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা গোলাম রহমান আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিযোগী দেশগুলোর উদ্যোক্তারা ৯-১০ শতাংশে ঋণ পাচ্ছেন, অথচ আমরা দিতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ। এতে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে।’
বিএবির সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা ঋণের সুদ কমানোসহ অনেক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছিলাম। কোনো বিষয়েই কোনো উত্তর এখনও পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃতি আর আমেরিকার অর্থনীতির প্রকৃতি এক নয়। এখানে অনেক বিষয়ে নীতিসহায়তার দরকার আছে। সে বিষয়ে আমরা যদি উদাসীন থাকি তাহলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post