ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত (এসএমই) বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য এই খাতের উন্নয়ন ও প্রসার অপরিহার্য। ছোট উদ্যোক্তারা যাতে সহজে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনা করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে পারে।
অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু: এসএমই উদ্যোক্তারা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ট্রেড লাইসেন্স নিতে গিয়ে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। তাই ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু সম্পূর্ণ অনলাইনে করতে হবে। একই সঙ্গে একটি ভেরিফিকেশন সিস্টেম থাকতে হবে, যাতে ব্যাংকগুলো ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করতে পারে, যেমন নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভারের মতো। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিআইএন বাধ্যতামূলক না করা: ট্রেড লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হলে তা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। এতে ছোট ব্যবসার সম্প্রসারণ ব্যাহত হতে পারে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার: ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্থিতির ওপর আবগারি শুল্ক আরোপের কারণে অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে নগদ লেনদেনে ঝুঁকছেন। তাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এই শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করা: দেশকে ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’-তে রূপান্তরের লক্ষ্যে ডিজিটাল লেনদেনে প্রণোদনা বাড়াতে হবে। এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ‘ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম’ আরও বিস্তৃত করা জরুরি। ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো সহজে ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্ট করতে পারবে এবং দ্রুত ঋণ প্রদান করা সম্ভব হবে।
সহজে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পার্সোনাল ও রিটেইল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা আরও সহজ করতে হবে, যাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা উদ্যোক্তারা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বৃদ্ধি: এসএমই খাতে প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা) অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। তাই বাজেটে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম সম্প্রসারণ: প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা জামানতের অভাবে ঋণ পান না। তাই এই স্কিমের আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
স্টার্টআপ গ্রান্ট: আইসিটি উদ্ভাবন তহবিলের একটি অংশ ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য সিড গ্রান্ট হিসেবে বরাদ্দ করা যেতে পারে, যা তাদের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াবে।
ওপেন ব্যাংকিং ফ্রেমওয়ার্ক: ডেটাভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এতে জামানত ছাড়াই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া সহজ হবে।
ফিনটেক স্যান্ডবক্স তহবিল: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সাশ্রয়ী পেমেন্ট গেটওয়ে তৈরি করতে ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে ‘রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স’ তহবিল গঠন করা উচিত। বাংলা কিউআর ব্যবহারে মার্চেন্ট সার্ভিস ফি (১.১৫ শতাংশ) মওকুফ করা হলে ডিজিটাল লেনদেন আরও বাড়বে।
রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল: এসএমই উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ‘মার্কেট অ্যাক্সেস ফান্ড’ তৈরি করা প্রয়োজন। এতে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।
বিনিয়োগবান্ধব বাজেটের প্রয়োজন: এসএমই খাতে অর্থায়ন বাড়লে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যা সরকারের ঘোষিত এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও উন্নত হবে। তাই একটি বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রয়োজন, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াবে।
পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা: পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতেÑ১. বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা; ২. প্রণোদনামূলক করনীতি; ৩. তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ৪. দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজার গড়ে তোলা। এ ছাড়া বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে জিরো কুপন বন্ডে কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post