আনোয়ার হোসাইন সোহেল: পুঁজিবাজারে তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো নতুন কিছু নয়। এ তালিকায় যোগ হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেড। মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মোবাইল অ্যাপস কুইক ট্রেড প্রো-এর মাধ্যমেই ডিএসইর তালিকাভুক্ত শেয়ার লেনদেন করতে পারেন বিনিয়োগকারীরা। মিডওয়ে সিকিউরিটিজের অ্যাপসে অস্বাভাবিক তথ্য উপস্থাপনা করা হয়েছে। গত ৭ মে দিনের লেনদেন শেষে ড্যাশবোর্ডে ১৫ কোটি টাকার গরমিলের তথ্য দেখে প্রাথমিকভাবে সিকিউরিটিজ কোম্পানিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই কারিগরি ত্রুটি মনে করলেও ৯ মে (গতকাল) পর্যন্ত ওই তথ্য একই রকম থাকায় এটি নিছক কারিগরি ত্রুটি নয় বলে জানিয়েছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজের তথ্য মতে, ডিএসইতে ৭ মে লেনদেন হয় ৮৫৯ কোটি টাকা, অপরদিকে ডিএসইর ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৮৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মিডওয়ের অ্যাপসে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ডিএসইর তথ্যে ১৫ কোটি টাকার গরমিল পাওয়া যায়। ওইদিন ব্লক মার্কেটে লেনদেন হয় ৬৪ কোটি টাকা। তবে ওই অর্থ মিডওয়ে তাদের অ্যাপসে যোগ করেনি। যদিও তারা এসএমই মার্কেটের লেনদেন হওয়া ১৫ কোটি টাকা তাদের অ্যাপসে যুক্ত করেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশিকুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের অ্যাপের সব তথ্য সরাসরি ডিএসই থেকে আসে। তাই এখানে ভুল তথ্য দেখানোর বা কোনো ধরনের গোপনীয়তার সুযোগ নেই। আমরা চাই আমাদের ক্লায়েন্টরা যেন সব তথ্য স্বচ্ছভাবে দেখতে পারে এবং কোনো ধরনের ব্লক মার্কেট বা সিভি ট্রেড সংক্রান্ত বিভ্রান্তিতে না পড়ে। এই কারণেই নিজেদের অ্যাপ তৈরি করেছি এবং এর পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করেছি, যাতে বিনিয়োগকারীরা নির্ভরযোগ্য ও সর্বশেষ তথ্য পান। অ্যাপে যে তথ্যগুলো দেখানো হয়, সেগুলো ডিএসইর ডেটার ওপর ভিত্তি করেই প্রদর্শিত হয়। কোনো তথ্য যদি ক্লায়েন্টের বুঝতে অসুবিধা হয়, তাহলে তিনি জিজ্ঞেস করতে পারেন এবং সেটি বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে দিই। এখানে গোপন করার মতো কিছু নেই। আমরা এসএমই মার্কেটে যে ১৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে তা ভলিউমে যুক্ত করেছি। এভাবেই ১৫ কোটি টাকা এডজাস্টমেন্ট করা হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, একটি শেয়ারের প্রকৃত ক্লোজিং প্রাইস নির্ধারিত হয় শুধু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে। এর বাইরে কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপসে তথ্য প্রকাশ করলে তা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করার উদ্দেশ্যে করা হতে পারে।
তিনি বলেন, এর আগে ডিএসই প্রায় ১২টি ওয়েবসাইট ও কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছিল, যেগুলো ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে বাজারে কৃত্রিম প্রভাব তৈরির চেষ্টা করছিল। এসব প্ল্যাটফর্ম এআই-জেনারেটেড তথ্য কিংবা বিকৃত ডেটা ব্যবহার করে শেয়ারের দাম, হোল্ডিং তথ্য বা বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে।প্রথম পৃষ্ঠার পর
আল আমিনের ভাষ্য, কোনো অনুমোদনহীন ওয়েবসাইট যদি ডিএসইর তথ্যের বাইরে ভিন্ন ক্লোজিং প্রাইস দেখায়, তাহলে সেটি স্বাভাবিক নয়। কারণ অফিসিয়াল ডেটার বাইরে আলাদা কোনো রেট হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু পোর্টাল ও মোবাইল অ্যাপ বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করতে স্পন্সর হোল্ডিং, ইনস্টিটিউশনাল হোল্ডিং কিংবা শেয়ারের দামের তথ্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী ইনস্টিটিউশনাল হোল্ডিং বেড়েছে বা কমেছেÑএমন তথ্য দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে কোনো ওয়েবসাইট ইচ্ছাকৃতভাবে এসব তথ্য পরিবর্তন করে প্রকাশ করলে বাজারে কৃত্রিম বাই বা সেল প্রেসার তৈরি হতে পারে।
তার মতে, ডিএসইর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যই বাজারের ‘রিয়েল পিকচার’। এর বাইরে ভিন্ন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের পেছনে উদ্দেশ্যমূলক অপতৎপরতা থাকতে পারে। এ ধরনের ঘটনা গণমাধ্যমে তুলে ধরলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে পারবে।
তবে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, কোনো অ্যাপসে ডিএসইর বাইরে অন্য কোনো ধরনের তথ্য দিলে আইনে কোনো ধরনের শাস্তির বিধান আছে কি নাÑআমি এই মুহূর্তে তা সঠিকভাবে বলতে পারছি না।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশিকুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ইবিএল আমাদের ক্লাইন্ট না। যেমন ধরুন, ইবিএল শেয়ারের ক্ষেত্রে ডিএসই ওয়েবসাইটে একটি সংখ্যা দেখা যাচ্ছে, আর আমাদের অ্যাপে অন্য সংখ্যা দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ ডিএসইতে যদি -১২ দেখায় আর অ্যাপে -৯.৮১% দেখায়, তাহলে সেটার কারণ হচ্ছে ‘পোস্ট রেকর্ড ডেট অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রাইস’। রেকর্ড ডেটের পরে কোনো কোম্পানি ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ার দিলে শেয়ারের দাম অ্যাডজাস্ট হয়। আমরা সেই অ্যাডজাস্টেড প্রাইস দেখাই, কারণ বিনিয়োগকারী রেকর্ড ডেটের পর যে দামে শেয়ার ধারণ করবেন, সেটিই তার জন্য কার্যকর দাম। তাই এই তথ্যটি বাস্তবসম্মত এবং বিনিয়োগকারীর জন্য বেশি প্রাসঙ্গিক। এখানে কোনো ভুল তথ্য আসে না, কারণ পুরো প্রক্রিয়াটি অটোমেটিক। ডিএসইর ওয়েবসাইটে এই ধরনের অ্যাডজাস্টেড ক্যালকুলেশন সবসময় দেখানো না হলেও, আমরা বিনিয়োগকারীদের সুবিধার জন্য সেটি আলাদাভাবে ক্যালকুলেট করে দেখাই। তাই দুই জায়গায় সংখ্যার পার্থক্য দেখা গেলেও সেটি ভুল তথ্য নয়, বরং উপস্থাপনার পার্থক্য।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, সাধারণত কোম্পানিগুলো ডিএসই ও সিএসই থেকেই তথ্য নিয়ে থাকে তবে। কোনো কোম্পানি যদি ভিন্ন সোর্স থেকে তথ্য নিয়ে অ্যাপসে প্রকাশ করে তাহলে আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে ওই কোম্পানিটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজ তাদের অ্যাপসে এসএমই মার্কেটের লেনদেনের তথ্য যোগ করলেও ব্লক মার্কেটের লেনদেনের তথ্য যুক্ত করেনি; যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post