নিজস্ব প্রতিবেদক : ইসলামী ব্যাংকের সদ্য চাকরিচ্যুত কর্মীদের আন্দোলনের নামে দেশব্যাপী অরাজকতা সৃষ্টির প্রতিবাদে এবং দখলদারমুক্ত ইসলামী ব্যাংক গঠনের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা।
গতকাল রোববার রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে আয়োজিত এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম। ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের ব্যাংক খাতে এস আলম গ্রুপের ‘অবৈধ নিয়োগ ও একচ্ছত্র দখলদারত্ব’ বাতিলের দাবিতে আয়োজিত ওই মানববন্ধনে বক্তারা ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এস আলমের প্রভাবে ইসলামী ব্যাংকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অবৈধ নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান।
একইসঙ্গে সারা দেশ থেকে মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নিয়োগের আহ্বান জানান তারা।
সমাবেশে ব্যবসায়ী শাহিন আহমেদ খান, মো. মোতাসিম বিল্লাহ, মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. ইমাম হোসাইন, অ্যাডভোকেট ওয়লিউল্লাহ, হাফিজুর রহমান ও ডিএম শওকত আলী বক্তব্য রাখেন।
এ সময় সচেতন পেশাজীবী গ্রুপ, ইসলামী ব্যাংক সিবিএ ও সচেতন ব্যাংকার সমাজও একই দাবিতে পৃথকভাবে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।
মানববন্ধনে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর পক্ষে ব্যবসায়ী শাহীন আহমেদ বলেন, ‘এস আলম গ্রুপ ও তাদের দোসররা ইসলামী ব্যাংকের দখল নিয়ে বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। ছাত্র–জনতা দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। ইসলামী ব্যাংকেও তাদের চিহ্ন রাখা হবে না।’
তিনি বলেন, ‘এস আলম নিজ বাড়ি ও হাটে বাজারে বক্স বসিয়ে কোনো ধরনের নিয়মনীতি না মেনে অবৈধভাবে চাকরি দিয়েছে। তাদের বাতিল করতে হবে। তাদের কারণে ইসলামী ব্যাংক এখন খারাপ দশায়। সেবার মান কমে গেছে। আমরা চাই যাদের কারণে ব্যাংকের এই জীর্ণ হাল তারা চলে যাক।’
ইসলামী ব্যাংক সাত বছরের বেশি সময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে আমূল পরিবর্তন আনা হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, এস আলম ইসলামী ব্যাংক দখলের পর ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন পদে শুধু চট্টগ্রামের ৭ হাজার ২২৪ জনকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ৫০০ জনের বেশি পটিয়া উপজেলার। দেশের ৬৩ জেলার প্রার্থীদের বঞ্চিত রেখে এক জেলার প্রার্থীদের প্রাধান্য দেয়ায় ব্যাংকের সেবার মান ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
তারা বলেন, এসব নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই গ্রাহকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, পেশাদার সেবা দিতে অক্ষম, এমনকি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলায় গ্রাহকরা যোগাযোগে সমস্যায় পড়েন। এভাবে ব্যাংক চালানো সম্ভব নয়, এ কথা বলেন এক বক্তা।
বক্তারা অবিলম্বে এসব অবৈধ নিয়োগ বাতিল করে সারা দেশ থেকে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এদিকে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ইসলামী ব্যাংক গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে মূল্যায়ন পরীক্ষা আয়োজন করে। ওই পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য ৫ হাজার ৩৮৫ কর্মকর্তাকে ডাকা হলেও মাত্র ৪১৪ জন অংশ নেন। বাকি ৪ হাজার ৯৭১ জন পরীক্ষায় অংশ না নেয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের ওএসডি করে এবং ৪০০ জনকে চাকরিচ্যুত করে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তাদের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এর পর থেকে গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের অযৌক্তিক কর্মসূচি পালনের নামে সড়কের যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে দেখা যায় চাকরিচ্যুত কর্মীদের।
গত শুক্রবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা রোববার থেকে টানা কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। পাঁচ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
পরের দিন শনিবার ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ইসলামী ব্যাংকের ‘বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন’ পরীক্ষার তালিকায় থাকা কর্মকর্তারা। মহসড়কের সীতাকুণ্ড উপজেলার ফৌজদারহাট এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচির কারণে ওই এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের তৎপরতায় বেলা ১টার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গতকাল রোববার ঢাকায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ব্যাংক লুটেরা এস আলম ও তার নিয়োগপ্রাপ্ত অযোগ্য কর্মকর্তারা অযৌক্তিক কর্মসূচির নামে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন। তাদের অপসারণ না করা হলে গ্রাহকরা একে একে ইসলামী ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
তারা আরও বলেন, অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তার পেছনে বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হওয়ায় গত সাত বছরে ব্যাংকটির ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। এই বিশাল আর্থিক বোঝা এবং ব্যাংক থেকে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি লোপাট হওয়ার অভিযোগ–সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post