নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও দেশব্যাপী নারীদের স্বাবলম্বী করতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রম। দেশের প্রথম ধাপের পাইলট প্রকল্প হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রায় ৩৭ হাজার নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিবারগুলো মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশব্যাপী চার কোটি পরিবার এই সুবিধা পাবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানী টিঅ্যান্ডটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থেকে কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে ছিলেন তার সহধর্মিণী ড. জুবাইদা রহমান, মহিলা ও শিশু ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্য, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত সাধারণ ভোটাররা উদ্বোধন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। তাদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না করে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করাই আমাদের সরকারের লক্ষ্য।’
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচনের সময় বিএনপি জনগণের কাছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সরকার গঠনের এক মাসের কম সময়ের মধ্যে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বলা হয়, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। তাই জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহিতা আছে। নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছি, সেগুলো বাস্তবায়ন করাই আমাদের দায়িত্ব।’
ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রোটোকল ভেঙে মঞ্চে ওঠার আগে মাঠে উপস্থিত নারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। পরে তিনি অনুষ্ঠানে ১৭ জন নারীর হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেন। কার্ড প্রদান শেষে প্রধানমন্ত্রী একটি ল্যাপটপে বাটন চাপ দিলে সঙ্গে সঙ্গে উপকারভোগীদের কাছে নগদ অর্থ চলে যায়। এ সময় উপস্থিত জনতা করতালিতে অনুষ্ঠানস্থল মুখর করে তোলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে কিছু ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবের কারণে কিছু কর্মসূচি বিলম্বিত হতে পারে। এছাড়া তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় নারীদের শিক্ষা প্রসারিত করার যুগান্তকারী উদ্যোগের উদাহরণ টানেন। ‘সেই শিক্ষিত নারী সমাজকে এখন আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চাই। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে,’ তিনি বলেন।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের প্রথম ধাপে ১৪টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। রাজধানীর কড়াইল, ভাসানটেক এবং সাততলা এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার নারী এই কার্ডের আওতায় আসছেন। অন্যান্য নির্বাচিত উপজেলায় কার্ড বিতরণ কার্যক্রম চলছে।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৪ এলাকা হলোÑঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বনানীর কড়াইল বস্তি, সাততলা বস্তি ও ভাষানটেক বস্তি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মিরপুর এলাকার অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি। রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়ন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর পৌরসভা, বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন, খুলনা সিটি করপোরেশন খালিশপুর থানা এলাকা ও ভোলা জেলার চরফ্যাশন থানার আসলামপুর ইউনিয়ন। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানার কুলঞ্জ ইউনিয়ন, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার শিমুলকান্দি ইউনিয়ন ও বগুড়া জেলার বগুড়া সদর থানার শাখারিয়া ইউনিয়ন। নাটোর জেলার লালপুর থানার ঈশ্বরদী ইউনিয়ন, ঠাকুরগাঁও জেলার ঠাকুরগাঁও সদর থানার রহমানপুর ইউনিয়ন ও দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানার জয়পুর ইউনিয়ন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত মন্ত্রী ও স্থানীয় নেতারা বিভিন্ন এলাকায় নারীপ্রধানদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন।
ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন উপস্থিত থেকে কার্ড বিতরণ করেন। বগুড়া সদর উপজেলার শাখারিয়া ইউনিয়নে জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান ৪৯৬ পরিবারের নারীদের হাতে কার্ড প্রদান করেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড নারীদের ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, নারীর পরিবারের ভেতরে অবস্থান শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।’ একইভাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নই দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। তাই কার্ড বিতরণে নারীপ্রধানদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনী বক্তব্যের সঙ্গে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দলীয় সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড-সম্পর্কিত একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠানটি পবিত্র কোরআন, বেদ, ত্রিপিটক ও বাইবেল থেকে পাঠের মাধ্যমে শুরু হয়, যা স্থানীয় উপস্থিত জনতাকে আধ্যাত্মিকভাবে উদ্বুদ্ধ করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেষ বক্তব্যে নির্বাচনী সেøাগান ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ উচ্চারণ করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। সরকারের প্রতিশ্রুতিশীল এই উদ্যোগ দেশের নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে, সমাজে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দেশের নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, যা শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, নারীর সমাজে অবস্থান, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যও সামনে রাখছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে এবং দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post