নিলুফা আক্তার: বাংলাদেশে নারী শিক্ষায় অগ্রযাত্রা বর্তমানে বিশ্বদরবারে এক রোল মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষাÑপ্রতিটি স্তরেই ছাত্রীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি নানামুখী উদ্যোগের ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জেন্ডার সমতা অর্জনে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারী শিক্ষার প্রসারে বাংলাদেশ আজ এক অণুকরণীয় দৃষ্টান্ত। গত এক দশকে শিক্ষা খাতে সরকারের নারীবান্ধব নীতি এবং সামাজিক সচেতনতার ফলে নারী শিক্ষার্থীরা কেবল শ্রেণিকক্ষেই ফিরছে না, বরং সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার বর্তমানে প্রায় ৯৮ শতাংশ। মাধ্যমিক স্তরেও ছাত্রীদের সংখ্যা এখন ছাত্রদের চেয়ে বেশি। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার এখন ৯৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সরকারি তথ্য ও শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গত কয়েক বছর ধরে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ক্রমাগত ভালো ফলাফল করছে। মেয়েদের এই শিক্ষামুখী হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ কাজ করেছে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, বাল্যবিবাহ হ্রাস, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন বিশেষ করে সরকারের উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এই নীরব বিপ্লবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ নারী শিক্ষার প্রায় প্রতিটি সূচকে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে।
কেবল প্রাথমিক বা মাধ্যমিক নয়, উচ্চশিক্ষার আঙিনায়ও নারীদের পদচারণা এখন চোখে পড়ার মতো। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্বব্যিালয়গুলোতে ছাত্রীদের ভর্তির হার গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ইউজিসির তথ্যমতে, বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষায় নারীদের আগ্রহ আগামীর ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য এক বড় শক্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের উচ্চশিক্ষা জরিপ বলছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষর্থীর প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশই নারী। এক সময় উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকলেও বর্তমানে তা দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারী শিক্ষার অগ্রগতি এখন সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। নারীদের এখন কেবল শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপকভাবে উপস্থিতিই বাড়েনি বরং মেধাতালিকায় ছেলেদের সমান বা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকছে। ২০২৬ সালের সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী নারী শিক্ষাকে আরও উৎসাহিত করতে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলা সদরে অন্তত একটি করে মহিলা কলেজকে সরকারি করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যা প্রান্তিক পর্যায়ের মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করছে।
বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত বিষয়ে ছাত্রীদের আগ্রহ বাড়ছে। সরকারি পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী কোটা এবং বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করায় কারিগরি ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে নেই। ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতেও বাংলাদেশি তরুণীরা এখন বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে। বর্তমানে মেয়েরা কেবল মানবিক বা সাধারণ শিক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় কোডিং, রোবটিক্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় নারীদের আগ্রহ বাড়ছে। সরকারিভাবে ল্যাপটপ প্রদান এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে নারীদের জন্য বিশেষ কোটা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
নারী শিক্ষায় এত সাফল্যের মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়েদের বাল্যবিবাহ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝড়ে পড়ার হার কিছুটা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর কর্মসংস্থানে শিক্ষিত নারীদের অংশগ্রহণের হার এখনো আশানুরূপ নয়। ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই বিশাল শিক্ষিত নারী জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেবল সংখ্যার উন্নতি নয়, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে কাজ করছে। কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ কোটা ও বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা সম্মিলিতভাবে কাজ করছে যাতে কোনো মেয়েই মাঝপথে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেনÑবাল্যবিবাহ ও র্অনৈতিক সংকটের কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের পর ছাত্রীদের ঝরে পড়া রোধ করা এবং কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষার এই অগ্রগতির ফলে বাংলােেশর শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৪৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নারীরা এখন চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। সরকারি প্রাথমিক ব্যিালয়গুলোতে ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষক নিয়োগের নীতি নারী শিক্ষাকে আরও উৎসাহিত করছে। প্রান্তিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার উন্নয়নে আরও বেশি সচেতন করার জন্য সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাকে কাজ করে যেতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার এই অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে করপোরেট জগৎÑসবখানেই এখন শিক্ষিত নারীদের জয়জয়কার। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
গণমাধ্যমকর্মী
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post