প্রতিনিধি, রংপুর : নিজেদের ইচ্ছামতো শিক্ষকরা স্কুলে আসেন আর যান, আগমন-প্রস্থানে নেই সময়ানুবর্তিতা। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে গেলেও শিক্ষার্থীদের হাতের কাজ দিয়ে বেরিয়ে পড়েন অনেকেই।
গল্পগুজব আর আরাম-আয়েশ নিয়ে ব্যস্ত কিছু শিক্ষক, প্রধান শিক্ষকরা অফিস আর অফিসারদের মেইনটেইন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর শিক্ষা কর্মকর্তারা কৌশল করছেন, কী কাজ শিক্ষকদের দিলে আর্থিক সুবিধা নেয়া যাবে। বিদ্যালয়ের পুরোনো আসবাবপত্র বিক্রির কমিশন নেয়া নিয়ে ব্যস্ত টিও, এটিওরা। শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থী বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের জমি অবৈধ দখলমুক্ত ও দোকানপাট অপসারণ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। শিক্ষকদের চিন্তা কবে মাস শেষ হবে, মাইনে পাব আর অফিসারদের টার্গেট শিক্ষকদের কোনো কাজ দিলে বা কী করলে বেশি সুবিধা নেয়া যাবে।
ঘটনাটি ঘটেছে রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলায়। পীরগাছায় ১৭৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৩ হাজার ৩৭০ জন শিক্ষার্থী আছে। ১ হাজার ১৩১ পদের বিপরীতে কর্মরত শিক্ষক আছেন ৯৮২ জন।
জানা গেছে, বর্তমান উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবুল হোসেন পীরগাছায় যোগদানের পর থেকে বিদ্যালয় পরিদর্শন বাড়লেও মান উন্নয়ন হয়নি শিক্ষার। এ উপজেলায় কর্মরত প্রাথমিকের শিক্ষকদের বৃহৎ সংখ্যা রংপুর শহরে থাকেন, তাদের সন্তানদের নামি-দামি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করানোর জন্য। অথচ তারা নিজেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোমলমতি শিশুদের পড়ালেখার দায়িত্বভার নিজেদের কাঁধে নিলেও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। যথাসময়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা আসা-যাওয়া করছেন না। ফলে দিন দিন শিক্ষার্থী হ্রাস পাচ্ছে। বিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা একদিন উত্তোলন করে তিন পরে রাতেও নামানো হয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা ঘুমিয়ে পড়েন। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মারামারি করছেন। তাদের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে পূর্ব পারুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে রাখেন স্থানীয়রা। পাঠদান না করা, অন্য এক বিদ্যালয়ের সভাপতি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ২ নম্বর স্বচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র অভিভাবক ইলিয়াস মাস্টারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিলের এক বছর পেরিয়ে গেলেও ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছেন। অভিযুক্ত ইলিয়াছ মাস্টার বিদ্যালয়ের ব্যবহার যোগ্য অযোগ্য চেয়ার-টেবিল, দরজা-জানালা বিক্রি করে পড়ালেখার মান উন্নয়নের কথা অকপটে স্বীকার করেন। মাঝে মধ্যেই দুই-একজন শিক্ষককে কৈফিয়ত তলব করা হয়, আবার অজ্ঞাত কারণে তাদের মওকুফ করা হয়।
পীরগাছা মডেলসহ প্রায় ৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছায়া ও ফল প্রদানকারী গাছ নামমাত্র মূল্যে নামে-বেনামে নিলামে দেয়া হয়। পরে নিলাম গ্রহীতার নিকট হতে কৌশলে শতবর্ষী গাছের গুঁড়ি নিয়ে অফিসার-শিক্ষকদের বাসাবাড়ির ফার্নিচার তৈরি করেছেন। গাছ নিলামের কারণে গরমের মৌসুমে অ্যাসেম্বলি-সমাবেশ করা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো ভুবনের চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ, ৮০টি ফ্যান, পুরোনো দরজা-জানালা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিলাম ছাড়াই প্রায় আড়াই লাখ টাকা বিক্রি করে আত্মসাৎ করেছেন।
পুরোনো আসবাবপত্র ক্রয়কারী আব্দুল লতিফ বলেন, আমাকে ডেকে নিয়ে বিক্রি করতে চেয়েছেন, আমি টাকা দিয়ে কিনেছি। শিক্ষার্থী ও অবকাঠামো অনুপাতে শিক্ষকের পদায়ন নেই। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা বসে বসে অলস সময় পার করেন, আবার কোথাও শিক্ষকের অভাবে শ্রেণি পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ছোট ঝিনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজন হিন্দু শিক্ষার্থী, কর্মরত চারজন শিক্ষকের মধ্যে তিনজনই হিন্দু। হিন্দু শিক্ষক দিয়ে ইসলাম শিক্ষা পাঠদানে বাধ্য করা হচ্ছে। অপরদিকে মডেল সরকারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭৭ জন হিন্দু শিক্ষার্থী অথচ সনাতন ধর্মাবলম্বী একজন শিক্ষকও নেই। ফলে একদিকে কোমলমতি ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা হতে হচ্ছে বঞ্চিত, অপরদিকে হিন্দু শিক্ষক দিয়ে ইসলাম শিক্ষার শ্রেণি পাঠদান করানোয় ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষক কারণে-অকারণে অফিসারদের পরামর্শে চিকিৎসাজনিত ছুটি নেন।
এরই মধ্যে দামুশ্বর মুক্তিযোদ্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মেজবাহুল ইসলাম বাড়িতে সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় থেকেই চিকিৎসাজনিত ছুটি কাটিয়েছেন বলে এলাকাবাসী নিশ্চিত করেছেন।
দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি করেন উপজেলা শিক্ষা অফিস। জেলার অন্যান্য উপজেলায় প্রশ্নপত্র বিক্রি করেন আট-নয় টাকায় আর পীরগাছায় বিক্রি করেছেন ১৫ টাকা। শিক্ষকরা বাধ্য হয়েছেন চড়ামূল্যে প্রশ্ন ক্রয় করতে।
অপর একটি সূত্রে জানা যায়, প্রশ্ন বিক্রির লভ্যাংশ এটিও হতে ডিপিইও পর্যন্ত বণ্টন করা হয়েছে; যা নিয়ে শিক্ষকদের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কোনো কোনো শিক্ষক মন্তব্য করেছেন, টিও স্যার কৌশলে সিøপের টাকার ভাগ নিচ্ছেন।
বিদ্যালয়ের জমির সীমানা নির্ধারণ না করে প্রাচীর করা হচ্ছে। এরই মধ্যে নগরজিৎপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিতে ঘর নির্মাণসহ প্রাচীর দিতে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। কুটিপাড়া ও অন্নদানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অসংখ্য স্কুলের জমিতে দোকান নির্মাণ করে ভারা উঠানো হচ্ছে। এই ভারার টাকা কে উঠাচ্ছেন, কেন উঠাচ্ছেন এবং কীভাবে ব্যয় হবে কেউ জানেন না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ১০ হাজার টাকা করে ঘুসের বিনিময়ে শিক্ষা অফিসকে ম্যানেজ করে যেখানে-সেখানে কিন্ডারগার্টেন স্কুল চালাচ্ছেন। শুধু এতেই শেষ নয়, বিভিন্ন ব্যক্তিকে সরকারি বই দেয়ায় ব্র্যাকের আদলে বিভিন্ন স্পটে স্কুল চলায় প্রাইমারিতে শিক্ষার্থী দিন দিন হ্রাস হচ্ছে।
অনেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান শিক্ষা অফিসে টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না, আবুল হোসেন স্যার এটিও হিসেবে পীরগাছায় চাকরি করেছেন, তিনি সবাইকেই চেনেন। তিনি কিছু শিক্ষককে তার খুব বিশ্বস্ত হিসেবে ব্যবহার করায় তাদের দিয়ে ঘুস লেনদেন করেন। এ ধরনের নানা অসংগতির কারণে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন হচ্ছে না।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবুল হোসেন বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে জানালে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post