নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক (গার্মেন্ট) খাতের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ‘আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার ও শ্রমিক-কর্মচারীদের মাসের পর মাস বেতন না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। একদিকে প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দীর্ঘ ৯ থেকে ১২ মাস ধরে বেতন না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন; অন্যদিকে মালিকরা বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, এমন অভিযোগ উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে বকেয়া বেতনের জন্য ধরনা দিয়েও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। উল্টো ন্যায্য পাওনা দাবি করায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত মিথ্যা মামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে আমদানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগে মালিকপক্ষের পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলছে, কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ যাচাইয়ে অভ্যন্তরীণ অডিট চলছে। অডিট শেষেই বেতনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কোম্পানিসংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ৯ থেকে ১২ মাস ধরে বেতন বকেয়া থাকায় নিরুপায় হয়ে প্রতিষ্ঠানের ২২ জন এজিএম, সিনিয়র অফিসার এবং মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা রাজধানীর গুলশানের নিকেতন অফিসে টানা ৪৮ ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ১০ মে নির্ধারিত তারিখেও বেতন না পেয়ে কর্মীরা যখন অফিসে অনড় অবস্থানে থাকেন, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের ভয় দেখাতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও বহিরাগতদের অফিসে আনা হয়। এই চেষ্টা ব্যর্থ হলে গভীর রাতে (আনুমানিক রাত ১টায়) গুলশান থানার পুলিশকে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের উপস্থিতিতে ম্যানেজমেন্ট বকেয়া মেটানোর জন্য আরও দুই দিনের সময় নেয়।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার মোহাম্মদ মেহেদী হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের বলা হয়েছিল, আমরা যেন কোনো মিডিয়া বা বাইরে কোথাও না যাই। আলিফের ক্ষতি না করলে আমাদের টাকা পরিশোধ করা হবে। কিন্তু যেহেতু এখন তারা টাকা দিচ্ছে না, তাই বাধ্য হয়েই আমাদের কঠোর অবস্থানে যেতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি আগে বিলকিস টাওয়ারে হেড অফিস পরিচালনা করত। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অফিস স্থানান্তর করা হয় নিকেতনের হাউস নম্বর ৪৭, রোড নম্বর ১৪, ব্লক জি এলাকায়। গত বছর থেকেই বেতন নিয়ে আমাদের টালবাহানা শুরু হয়। তিন-চার মাস পরপর একবার করে বেতন দেওয়া হতো। এভাবে চলতে চলতে আমাদের ৯ থেকে ১২ মাসের বেতন বকেয়া পড়ে। কিছু কর্মী যারা কাছের ছিলেন, তাদের বেতন নিয়মিত দেওয়া হতো। বেতন না পাওয়ায় অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, আবার কেউ কেউ ভরসা করে থেকেছে যে হয়তো প্রতিষ্ঠান বিষয়টি সমাধান করবে।
তিনি অভিযোগ করেন, নতুন অফিসে স্থানান্তরের পর প্রথম তিন মাসে ৩০ থেকে ৪০ জনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বেতন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সিইও তুহিন রেজার সঙ্গে বৈঠকে বসলে তিনি আমাদের জানান, অ্যাকাউন্টসের হেড বিজয় সরকারের সঙ্গে বসে সবকিছু ঠিক করে তোমাদের টাকা আমরা বিকাশে ও ব্যাংকে দিয়ে দেব। তোমাদের আর কষ্ট করে অফিসে আসতে হবে না। এরপর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ বার অফিসে গিয়েছি, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বসে থেকেছি, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান পাইনি। ১০ মে সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার পরও বেতন না পেয়ে ২২ জন এজিএম, সিনিয়র অফিসার ও মার্কেটিং বিভাগের কর্মীরা অফিসে একসঙ্গে অবস্থান নিই, কিন্তু সেই সময়েও টাকা দেওয়া হয়নি। পরে রাত ১০টায় জানানো হয় আরও দুই দিন সময় লাগবে।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে তুহিন রেজা কো-অর্ডিনেটর সোহেলকে পাঠান, যিনি এসে জানান কোনো আপডেট নেই। এরপর ‘বেতন না নিয়ে যাব না’ বলে আমরা অনড় অবস্থানে থাকলে সোহেল স্থানীয় ছাত্রদলের নেতা নিয়ে আসে আমাদের ভয় দেখানোর জন্য। এই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত পুলিশ ডাকা হয় রাত প্রায় ১টায়। গুলশান থানার এসআই আলিম ঘটনাস্থলে এসে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর ম্যানেজমেন্ট আরও দুদিন সময় চায়। আমাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, অন্তত ৩৩ শতাংশ বকেয়া এখন পরিশোধ করতে হবে এবং বাকি টাকা ঈদের আগে সম্পূর্ণভাবে দিতে হবে। তবে এরপরও কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আমাদের এখান থেকে দু-একজন দরখাস্ত করেছিলেন। কিন্তু তারা কোনো সদুত্তর দিচ্ছেন না, যোগাযোগও করছেন না।
বেতন না পেয়ে দুঃশ্চিন্তায় হার্ট অ্যাটাক করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমার্শিয়াল ম্যানেজার আবুল হাসনাত বলেন, অসুস্থ অবস্থা বারবার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো ধরনের বকেয়া বেতন পাইনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির এক সাবেক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, চার মাস ধরে আমার বেতন পরিশোধ করছে না প্রতিষ্ঠানটি। বেতনের কথা বললেই নানাভাবে আমাদের আশা দিয়ে ঘোরাচ্ছে মালিকপক্ষ। আমরা অনেকভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা প্রতিবারই আমাদের বলেন, আরেকটু যেন ধৈর্য ধরেন। কোম্পানির মালিক আগে আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল, গানবাংলার তাপস, সাবেক মেয়রের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর মালিকপক্ষ এখন খারাপ অবস্থা পার করছে। এখন মালিকানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হচ্ছে। খুব দ্রুতই সব সমাধান হবে, দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
তার অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের এমন মিথ্যা আশ্বাসের ফুলঝুরিতে তাদের প্রত্যেকের পরিবারের পরিচালনা নিয়ে খুবই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমন বাস্তবতায় ঘরভাড়া, পরিবারের ভরণপোষণ, ছেলেমেয়ের লেখাপড়াসহ যাবতীয় সব খরচ এখন হুমকির মুখে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের সম্মানের দিকে তাকিয়ে আমরা এতদিন চুপ ছিলাম। কিন্তু এখন পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে।
গুলশান থানার এসআই আলীম শেয়ার বিজকে বলেন, গত সপ্তাহে তাদের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ার পর থানা ফোন দিয়েছিল। আমার ইমার্জেন্সি ডিউটি ছিল, আমি গিয়েছি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা ঈদের আগে হয়তো এক মাস বা কিছু পার্সেন্টেজ দিয়ে ঈদটা পার করবে। বাকিটা হয়তো ঈদের পরে, যেটা হোক সমাধান করে ফেলবে। তাদের (আন্দোলনকারী) মনে হয় ইমেইল বা চিঠি নাকি দিয়েছে, আমাকে বলছিল।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সিইও তুহিন রেজা শেয়ার বিজকে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান যদি কাক্সিক্ষত আয় করতে না পারে, তাহলে বেতন দেবে কীভাবে। তারপরও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। তবে স্টাফদের বেতন এখনো দেওয়া হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, মালামাল আত্মসাৎ এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ যাচাই করতে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ অডিট চলছে। বেতন ও অন্যান্য পাওনার বিষয়টি অডিট শেষে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অডিটে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মার্কেটিং বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে নির্ধারিত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় বেতন না নিয়েও কতিপয় কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা যদি সুযোগ-সুবিধা না পান তাহলে কাজ করছেন কেন। এখনো চাকরি ছেড়ে চলে যাননি কেন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকেও কোনো পদত্যাগপত্র জমা পড়েনি। সম্প্রতি নতুন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নিয়েছে। তারা সার্বিক কার্যক্রম পুনর্গঠন ও শৃঙ্খলায় আনার চেষ্টা করছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের একাংশ আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির পুঁজিবাজার কার্যক্রম থেকে কয়েকশ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোম্পানির এজিএম জিয়াউল হক জুয়েল এ-সংক্রান্ত দলিলপত্র তার কাছে সংরক্ষিত আছে বলে দাবি করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মোহাম্মদ হানিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এর আগে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সিআইডির এক কর্মকর্তা বাদী হয়ে রাজধানীর গুলশান থানায় এ মামলা করেন। ওই মামলার আসামিরা হলেনÑআলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আজিমুল ইসলাম এবং স্বাধীন পরিচালক রফিকুল ইসলাম, তানিম নোমান সাত্তার ও আজহারুল ইসলাম।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post