বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘকাল ধরেই এক গভীর আস্থার সংকটে নিমজ্জিত। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় বিনিয়োগ করে বুকভরা আশা নিয়ে বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন একদল অসাধু চক্র কৃত্রিম কারসাজির মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক সিটি ব্যাংকসহ বেশ কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের জরিমানা করার ঘটনাটি বাজারের সেই অন্ধকার দিকটিকেই আবারও জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে। ফাইন ফুডস লিমিটেড এবং অগ্নি সিস্টেমস লিমিটেডের শেয়ারের দাম নিয়ে যে ধরনের কারসাজি হয়েছে, তাতে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক সিটি ব্যাংকের নাম জড়িয়ে পড়া কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, বরং পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকেত।
কারসাজির ধরনটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ২০২৪ সালের শেষার্ধে যখন ফাইন ফুডস ও অগ্নি সিস্টেমসের ব্যবসায়িক কোনো মৌলিক উন্নতি ছিল না, ঠিক তখনই কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়েছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক বাজার প্রক্রিয়ায় অসম্ভব। এটি স্পষ্ট যে, একটি নির্দিষ্ট চক্র পরিকল্পিতভাবে শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করেছে এবং পরে সুবিধামতো সময়ে শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনে আটকা পড়েছেন, কারসাজিকারীরা তখন মুনাফা নিয়ে সটকে পড়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও একই কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে প্রায় ২ কোটি টাকা জরিমানা করার ইতিহাস থাকার পরেও পুনরায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে, বিদ্যমান শাস্তি বা জরিমানা এসব চক্রকে দমাতে যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এই অনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততা। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হওয়ার কথা ছিল বাজারের আস্থার প্রতীক এবং সুশাসনের অতন্দ্র প্রহরী। তারা যখন সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ব্যবহার করে শেয়ার বাজারের কারসাজিতে লিপ্ত হয়, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না। সিটি ব্যাংকের মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠানের ৪২ লাখ টাকা জরিমানার সম্মুখীন হওয়া বাজারের গভীর ক্ষতকেই নির্দেশ করে। যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিএসইসি জরিমানা করেছে; তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কেবল আর্থিক জরিমানা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। শেয়ার বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ফাইন ফুডসের মতো একটি কোম্পানি, যেটি ব্যবসায়িক মন্দা সত্ত্বেও কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে চলেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নিরীক্ষক প্রতিবেদনে যেখানে অসংগতি উঠে আসছে, সেখানে কারসাজিকারীরা কীভাবে বাজারকে প্রভাবিত করার সাহস পায়, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। পুঁজিবাজারকে জুয়াড়িদের আখড়া থেকে মুক্ত করতে হলে কেবল জরিমানা নয়, বরং ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিচার এবং সংশ্লিষ্টদের বাজার থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ হতে হবে; যাতে কোনো বড় ব্যাংক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে না থাকতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক কারসাজি বন্ধ না হলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কখনোই একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে না। আমরা চাই একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাজার, যেখানে কারসাজিকারীদের দাপট নয় বরং মেধা ও মৌলিক বিশ্লেষণের জয় হবে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post