শেয়ার বিজ ডেস্ক : কখনো যুবলীগ নেতা, আবার কখনো কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা; পরিচয় বদলে পারদর্শী এই ব্যক্তির নাম নজরুল ইসলাম। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপও পাল্টে যায়। কিন্তু পাল্টায় না তার পেশা— আর তা হলো চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন আর প্রতারণা।
অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রীদের সঙ্গে তোলা ছবিকে হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করাই এখন তার প্রধান কাজ।
অনুসন্ধান, মামলার বিবরণ আর তথ্য-উপাত্ত বলছে, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ইয়াকুব আলীর ছেলে নজরুল ইসলামের অপরাধ জগতে হাতেখড়ি অনেক আগে। ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত নিজের এলাকাতেই চুরি, ছিনতাই আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য তার বিরুদ্ধে অন্তত চারটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— গোয়াইনঘাট থানার মামলা নং-১০; তারিখ ১৩ জুন ২০০৮; ধারা ১৪৩/৩২৩/৩৭৯/১১৪, পেনাল কোড-১৮৬০। এ ছাড়া মামলা নং-১১; তারিখ ১০ জানুয়ারি ২০০৯; ধারা ৩২৩/১৪৩/৪৪৭/৩৭৯/৫০৬/৩৪, পেনাল কোড-১৮৬০।
এর আগে মামলা নং-০৪; তারিখ ০৪ জানুয়ারি ২০০৭; ধারা ১৪৩/৩২৩/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩৭৯, পেনাল কোড-১৮৬০ ধারায়ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এবং গোয়াইনঘাট থানার মামলা নং-৩০; তারিখ ২৯ জানুয়ারি ২০১৫; মামলাতেও তাকে এজাহারে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এরপর এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে ২০১৫ সালে পালিয়ে তিনি পাড়ি জমান চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়।
অভিযোগ উঠেছে, সাতকানিয়ায় গিয়ে নজরুল শুরু করেন নতুন খেলা| আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন মন্ত্রীদের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে নিজেকে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। এখন সরকার পরিবর্তনের পর তিনি বোল পাল্টে ফেলেছেন| হয়েছেন ‘কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা’। আবার কখনো পরিচয় দেন আমজনতার দলের তারেক রহমানের লোক হিসেবে। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে তোলা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।
নজরুলের দাপট এখন এতটাই বেড়েছে, খোদ ব্যবসায়ীদের কাছে গিয়ে দাবি করছেন বিলাসবহুল গাড়ি। গত ৬ এপ্রিল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সালামের দোকানে গিয়ে তিনি নিজেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে দাবি করেন। মন্ত্রীদের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে নজরুল হুমকি দেন—তাকে ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি গিফট করতে হবে, অন্যথায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলা দিয়ে জেলে ঢোকানোর হুমকিও দেন তিনি।
গোয়াইনঘাটের স্থানীয় সংবাদকর্মী এবং অনলাইন প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক রুবেল বলেন, নজরুল এবং তার ভাই মজিবুর মিলে একটি ট্রাভেল এজেন্সি চালু করে বিদেশে পাঠানোর নাম করে অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান।
নজরুলকে প্রতারক উল্লেখ করে এই সংবাদকর্মী বলেন, নজরুল বহুদিন ধরেই এলাকাছাড়া। প্রতারণাই নজরুলের প্রধান পেশা। এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে ছবি তুলে নজরুল দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে নানাভাবে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে গরু চুরির মামলাসহ বেশকিছু মামলা রয়েছে।
অভিযুক্ত নজরুলের বাবা ইয়াকুব আলীর সঙ্গেও কথা হয়। তিনিও বলেন, ‘নজরুল বহু বছর ধরে বাড়ি আসে না। অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে সে পালিয়েছে। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আসে আমাদের কাছে। তার যন্ত্রণায় আমরা অতিষ্ঠ।
এ সময় নজরুলের বাবা উল্টো নজরুলের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ তার বিভিন্ন অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরেন এবং যে কাউকে তার ছেলের কথা বিশ্বাস না করার আহ্বান জানান।
সম্প্রতি অভিযুক্ত নজরুলের ভাই মজিবুর তার বাবা-মাকে নিয়ে ফেসবুক লাইভে এসে নজরুলের প্রতারণার ফিরিস্তি তুলে ধরেন এবং নজরুলের কথায় বিশ্বাস করে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার অনুরোধ জানান।
স্থানীয়দের দাবি, নজরুলের দৌরাত্ম্য শুধু চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক চোরাচালান ও মাদক ব্যবসার একটি বড় অংশও এখন তার নিয়ন্ত্রণে। তার প্রভাবের ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তিনি অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ বিষয়ে জানতে নজরুলকে ফোন দিলে তিনি কথা শেষ না করেই ফোন কেটে দেন। এরপর তার হোয়াটসএপে যোগাযোগ করে অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post