আনোয়ার হোসাইন সোহেল: পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল ব্যাংক একের পর এক আইন ভাঙলেও প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দীর্ঘদিন সিকদার গ্রুপের হাতে থাকা ব্যাংকটির ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান- পরবর্তীকালে বিএনপি নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নেতৃত্বে বিএনপিপন্থি ছয়জন পরিচালকে নিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার নিয়েছেন। ব্যাংকের ডিমান্ড প্রমিসরি নোটের বিপরীতে ‘লেন্ডার অব দ্য লস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই অর্থ দেয়। দীর্ঘদিন
ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় ব্যাংকটি সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এ অর্থ পেয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ের পর সরকারের মন্ত্রী হওয়ায় ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং ব্যাংকটির আরেক পরিচালক জাকারিয়া তাহের।
এর আগে ২০০৯ সাল থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল সিকদার গ্রুপের জয়নুল হক সিকদার পরিবারের হাতে। তখন নিয়মবহির্ভূতভাবে এক পরিবার থেকে পাঁচজন পরিচালক, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিপরীতে ঋণ, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে । এর মধ্যে ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জয়নুল হক সিকদার মারা যাওয়ার পর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রিক সিকদার ও রন হক সিকদারের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে । একপর্যায়ে দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্বে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের গায়ে হাত তোলার ঘটনাও ঘটে বলে
ব্যাংক পাড়ায় গঞ্জন ছড়ায়। একপর্যায়ে এমডি পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি দিলেও সেই চিঠি ফেরত দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। এরপর ২০২৪ সালের মে মাসে কেন্দ্ৰীয় ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয় এস আলম গ্রুপের হাতে।
পুঁজিবাজার ও ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, আর্থিক অনিয়মে জর্জরিত তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইন ভেঙে চলেছে। তবে ক্ষমতাধরদের আশ্রয়- প্রশ্রয়ের কারণে ন্যাশনাল ব্যাংক প্রায়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কচ্ছপ গতিতে এগুচ্ছে।
পুঁজিবাজারের বিধি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি পরিচালকের ব্যক্তিগতভাবে ন্যূনতম দুই শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক । তবে এসব নিয়ম মানছে না ন্যাশনাল ব্যাংক। ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর প্রভাব থাকায় ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে, যা ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আইন থাকার পর কেনো ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতি নমনীয় বিএসইসি ও ডিএসই জানতে চাইলে ডিএসইএর উদ্যোক্তা পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আইন থাকার পরও যদি তা কারও বেলায় কার্যকর বা বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে এমন আইন না থাকাই ভালো । এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা ও ব্যর্থতা প্রকাশ করে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের শেয়ার ছিল ১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এক মাস পর ফেব্রুয়ারিতে তা আরও ২ দশমিক ১৫ শতাংশ কমে গেলেও কোনো ডিসক্লোজার দেওয়া হয়নি। তবে হঠাৎ করেই ৩১ মার্চ ২০২৬ ন্যাশনাল ব্যাংকের স্পন্সর ডিরেক্টরদের শেয়ার দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ গত মাসে কোনো ডিসক্লোজার না দিয়েই হঠাৎ করে কোম্পানিটির স্পন্সর ডিরেক্টরদের শেয়ার বেড়েছে ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ । এর আগে গত মার্চ মাসে ব্যাংকটির শেয়ার কাঠামোয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ৩৬ দশমিক ৫১ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ দশমি এবং শেয়ার। বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ার কাঠামোয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ৩৬ দশমিক ৬১ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫১ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৪৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটির ১০ টাকার শেয়ারদর ফেসভ্যালুর নিচে রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির প্রতিটি শেয়ারদর ৪ টাকা ৭০ পয়সা । ন্যাশনাল ব্যাংকের মালিকদের শেয়ার লেনদেনের বিষয়ে জানতে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আদিল চৌধুরীকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ পাঠালেও তিনি তার কোনো উত্তর দেননি।
এরপর ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) কৃষ্ণ কমল ঘোষকে কল করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমি মনে হয় রাইট পারসন নই। আপনি যে প্রশ্নটা করেছেন এর কোনো আপডেট তথ্য আমার কাছে নেই। দুঃখিত, আমি এ বিষয়টা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না। কোম্পানির অ্যাজ এ সিএফও হিসেবে এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।’ ন্যাশনাল ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের শেয়ার লেনদেন বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পরিচালক হওয়ার জন্য কোনো শেয়ারের বাধ্যবাধকতা নেই। কারও যদি একটা শেয়ারও থাকে সে পরিচালক হতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে মূলধন নিয়ে। ব্যাংকটির স্পন্সর ডিরেক্টর শেয়ার কিনছে কি না, সে বিষয়ে বিএসইসি ও ডিএসইর আইন আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা রুলস আছে—কেউ যদি পাঁচ শতাংশের বেশি শেয়ার কেনে তাহলে সে হবে সিগনিফিকেন্ট শেয়ারহোল্ডার। তাকে
অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। মানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া পাঁচ শতাংশের বেশি শেয়ার কেউ কিনতে পারবে না। আর বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা ১০ শতাংশ পর্যন্ত অনুমতি দিতে পারবে। সেই ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের আছে ।
ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালকরা কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে শেয়ার কেনা-বেচা বা হস্তান্তর অথবা দান-সংক্রান্ত কোনো আবেদন করেছে জানতে চাইলে শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, এ বিষয়ে তারা বিআরপিডিতে আবেদন করেছেন কি না আমার জানা নেই ।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে পরিচালকদের যোগসাজশে প্রায় ১ হাজার ১৫৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ ঘটনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ৫৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে এক সময়ের শক্তিশালী এই ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকের তালিকায় চলে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ২০ আগস্ট নতুন বোর্ড গঠন করা হয় ।
নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা হিসেবে জামানত ছাড়াই ছয় হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ৯৮৫ কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে ।
তবে এসব ঋণের নির্ধারিত সময় পার হলেও পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকটি। পরে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। পাশাপাশি চলতি হিসাবে ঘাটতি রেখেও লেনদেনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকটি এসএলআর ঘাটতিতে রয়েছে, যা বর্তমানে ৪ হাজার ১০ কোটিতে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সিআরআর ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল ব্যাংক কোম্পানির স্পন্সর ডিরেক্টরদের শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে ডিসক্লোজার দেওয়া বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির স্পন্সর ডিরেক্টরদের শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে অবশ্যই স্টক এক্সচেঞ্জের ডিসক্লোজারের মাধ্যমে জানাতে হবে। কেনাবেচা শেষ করার পরেও তথ্য জানাতে হবে । এই তথ্য না জানানো দ্য সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এবং ডিএসই লিস্টিং রেগুলেশন, ২০১৫ এবং বিএসইসি অর্ডিন্যান্স
১৯৬৯-এর লঙ্ঘন ।
এর আগে ন্যাশনাল ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. কায়সার রশিদ শেয়ার বিজকে বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের শেয়ার কম থাকলেও তারা শেয়ার ছাড়েননি, বরং হোল্ড অবস্থায় রেখেছেন। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বিষয়টি আপাতত স্থগিত রয়েছে।
গত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির ৪২ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২২ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, মোট ঋণের যা ৫১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post