শেয়ার বিজ ডেস্ক: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক আউটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইএমএফ বলেছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে চলে যেতে পারে।
তেল, গ্যাস, খাবারের দাম বেড়ে চলতি বছর ও আগামী বছরজুড়ে তা অপরিবর্তিত থাকলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এমনটি ঘটতে পারে বলে জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
“এর মানে হচ্ছে- বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার খুব কাছাকাছি পরিস্থিতি তৈরি হওয়া, যা ১৯৮০ সালের পর মাত্র চারবার ঘটেছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হল কোভিড-১৯ মহামারীর সময়”, বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে ইরানে যুদ্ধ শুরুর পরপরই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে।
এরপর গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পাকিস্তানে দুই দেশের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে সংকট না কাটায় জ্বালানির দামেও এর প্রভাব পড়ে চলেছে।
আইএমএফ বলছে, “আবারও বিশ্ব অর্থনীতি লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এবার গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে এই ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।”
সংস্থাটি আরও বলেছে, তেলের দাম চলতি বছর গড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে ২০২৭ সালে ১২৫ ডলারে পৌঁছলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ করে দিতে পারে।
এই মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে আইএমএফ বলেছে, আগামী বছর মূল্যস্ফীতি প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।
আইএমএফ-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ের গোরিনচা বিবিসি-কে বলেন, “বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বিশ্ব মন্দার ধারণা কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
“সুতরাং, ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এমন এক পরিস্থিতি, যা বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের কাছে মন্দার সময়ের মতো মনে হবে। বেকারত্ব বাড়বে। কিছু দেশের জন্য, খাবারের দাম এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধের সময় তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলারে উঠেছিল। কিন্তু তারপর থেকে তা কমেছে। মঙ্গলবার এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৮ দশমিক ৮৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
আইএমএফ বলছে, গুরুতর পরিস্থিতি দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলতে থাকলে মন্দার ঝুঁকি কেবল বাড়বে।
সংস্থাটি বলেছে যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাতের সমাধান হলে এবং এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াবে।
তবে এই প্রবৃদ্ধিও আগের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের চেয়ে কম হবে। আইএমএফ অবশ্য আগামী বছরের জন্য তাদের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর বিষয়ে আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়ে বলেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আইএমএফ চলতি বছরের জন্য যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৮ শতাংশ করেছে।
তবে সংস্থাটি আশা করছে যে, এরপর যুক্তরাজ্য ১ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
তাছাড়া, আইএমএফ আরও পূর্বাভাস দিয়েছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে এবছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তীব্র মন্দা বা সংকোচন দেখা যেতে পারে।
ওদিকে, আইএমএফ এর হিসাবে, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হবে। তবে যদি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়, তাহলে ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।
তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রধান সরবরাহকারী দেশ কাতারের মতো কিছু দেশে ইরানের হামলায় অনেক শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সেগুলো পুরোপুরি চালু হতে কিছু সময় লাগবে।
এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে, এবছর কাতারের অর্থনীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হবে। তবে পরের বছর তা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে।
তাছাড়া, যুদ্ধের কারণে এবছর ইরানের প্রতিবেশী দেশ ইরাকের অর্থনীতি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কমবে। তবে ২০২৭ সালে তা ১১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে বলেও আইএমএফ আশা প্রকাশ করেছে।
আইএমএফ বলেছে, কোনও দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। এর মধ্যে আছে- জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ছাড়া হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা এবং বিকল্প রপ্তানি পথের সহজলভ্যতা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post