শেয়ার বিজ ডেস্ক: ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ বহাল থাকা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করার প্রতিশ্রুতিতে অনড় অবস্থান নিয়েছে ইরান। চলতি সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে আলোচনার পথ খুঁজতে মধ্যস্থতাকারীরা যখন দৌড়ঝাঁপ করছেন, তখনই তেহরানের পক্ষ থেকে এই কঠোর বার্তা এলো।
শনিবার প্রণালিটি অতিক্রমের চেষ্টাকারী জাহাজগুলোর ওপর গুলিবর্ষণের পর, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা অব্যাহত রাখবে তেহরান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক কালিবাফ বলেন, ‘আমরা নিজেরা যেখানে যাতায়াত করতে পারছি না, সেখানে অন্যদের জন্য হরমুজ প্রণালি উš§ুক্ত থাকা অসম্ভব।’
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের নৌবাহিনী ইতোমধ্যে জাহাজগুলোকে এই জলপথ ব্যবহার না করার জন্য সতর্ক করেছে। শনিবার যাতায়াতের প্রচেষ্টায় সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেলেও, ভারতের পতাকাবাহী দুটি জাহাজে গুলিবর্ষণের ঘটনার পর পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত অন্যান্য জাহাজগুলো পিছু হটে।
জাহাজগুলোর এই পিছু হটা প্রণালিটিকে যুদ্ধবিরতি-পূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরিয়ে নিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট আরও গভীর করার এবং আট সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাতকে পুনরায় পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধে রূপ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী বুধবার শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ইরান শনিবার জানিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নতুন প্রস্তাব পেয়েছে এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা সরাসরি আলোচনার পরবর্তী ধাপ আয়োজনের চেষ্টা করছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর এই অবরোধ আরোপ করা হয়। ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা সম্ভবত তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে। অন্যদিকে, মার্কিন এই বন্দর অবরোধ ইরানের দুর্বল অর্থনীতিকে আরও সংকুচিত করছে।
যুদ্ধবিরতি চললেও হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা অঞ্চলটিকে পুনরায় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে কমপক্ষে ৩,০০০, লেবাননে ২,২৯০ জনের বেশি, ইসরায়েলে ২৩ জন এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে এক ডজনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ১৩ জন মার্কিন সেনাও প্রাণ হারিয়েছেন।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিলেও ট্রাম্পের এক মন্তব্যে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ট্রাম্প জানান, তেহরান চুক্তিতে না আসা পর্যন্ত ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ ‘পুরো মাত্রায় বজায় থাকবে’। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও প্রণালিতে তাদের কড়াকড়ি পুনর্বহাল করে।
ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ জানিয়েছে, রিভল্যুশনারি গার্ডের গানবোট একটি ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে এবং একটি কন্টেইনার জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই ‘গুরুতর ঘটনার’ বিষয়ে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে, বিশেষ করে ইরান এর আগে ভারতগামী বেশ কিছু জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার পর এই হামলায় ভারত ক্ষুব্ধ।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, ‘আমেরিকানরা তাদের ভুল হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। তারা পুরো যুদ্ধবিরতি প্যাকেজটিকেই হুমকির মুখে ফেলছে।’
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এই অবরোধকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। তারা জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অধিকাংশ সরবরাহ এই প্রণালি দিয়েই যায়, তাই যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইরান এই যাতায়াতের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। এর অর্থ হলো, জাহাজগুলোকে ইরানের নির্ধারিত রুট অনুসরণ, ফি প্রদান এবং ট্রানজিট সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে হবে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘নতুন প্রস্তাব’ দেওয়া হলেও খাতিবজাদে জানিয়েছেন, তারা এখনই সরাসরি আলোচনার জন্য প্রস্তুত নন কারণ আমেরিকানরা এখনও তাদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে আসেনি। এ ছাড়া ইরান তাদের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবকেও সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শনিবার বলেন যে, কথোপকথন চলছে এবং শীঘ্রই আরও তথ্য জানা যাবে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘তারা (ইরান) আমাদের ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে না।’ সূত্র: এবিসি নিউজ
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post