মোহাম্মাদ জামাল উদ্দিন : যদি আপনার কোনো স্বজন বা বন্ধু মহলের কোনো ব্যক্তি প্রবাসে থাকেন, অথবা ঘুরতে বা বেড়াতে গিয়ে সেখানে আকস্মিক দুর্ঘটনা, হার্ট অ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক অথবা অন্য কোনো কারণে বা স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেন, তবে আপনার সামনে প্রধান যে প্রতিবন্ধকতা দাঁড়ায় তা হলো, মৃত ব্যক্তির মরদেহ কীভাবে স্বদেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফিরিয়ে আনা যায়।
মৃত ব্যক্তির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তির শিকার হন। তারা অনেক ধরনের ভোগান্তির মধ্যে পড়েন। বেশির ভাগ মানুষই বুঝে উঠতে পারেন না, ‘এখন আমাদের কী করণীয়?’ আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানব এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনটার পর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং কতটা সহজে আমরা আমাদের স্বজনের মরদেহ পেতে পারি।
যদি কোনো স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব প্রবাসে মৃত্যুবরণ করেন, তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, মৃত ব্যক্তির মরদেহ একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকে।
প্রথমে আসি, সংশ্লিষ্ট প্রবাসী যে দেশে মারা গেছেন, সেখানকার যেসব প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে সে প্রসঙ্গে।
ব্যক্তিটি যে দেশে মারা যান সেখানকার—
(১) সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
(২) সে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
(৩) সে দেশের লাশ সংরক্ষণকারী এবং প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান।
(৪) সে দেশের যে প্রতিষ্ঠানে মৃত ব্যক্তি কর্মরত ছিলেন ওই প্রতিষ্ঠান।
(৫) মৃত ব্যক্তির পক্ষে নিযুক্ত তার নিকটতম আত্মীয় অথবা কর্মরত প্রতিষ্ঠানের নিযুক্ত কর্মকর্তা।
(৬) যে দেশে মৃত্যুবরণ করেছেন, সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, যেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, সে দেশের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রক্রিয়া সে দেশের আইন অনুসারে মৃত ব্যক্তির পক্ষে নিযুক্ত নিকটাত্মীয় বা কর্মরত প্রতিষ্ঠানের নিযুক্ত ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে নিয়ম অনুসারে সম্পন্ন হবে। মৃত ব্যক্তির পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজ তারাই সরবরাহ করবেন।
এখন আসা যাক আমাদের দেশে মৃত ব্যক্তির যেসব আত্মীয়স্বজন, মা-বাবা ও ওয়ারিশ রয়েছেন তাদের করণীয় প্রসঙ্গে।
প্রথমেই আমাদের নিম্নোক্ত কাগজপত্র ও তার ফটোকপির ব্যবস্থা করতে হবে।
(I) মৃত ব্যক্তির পাসপোর্টের কপি।
(II) মৃত ব্যক্তির এনআইডি ও জন্মসনদের কপি।
(III) মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ সনদ (মূল+ফটোকপি)। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের অধীনে হলে সেখান থেকে প্রদত্ত/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত অনলাইন ওয়ারিশ সনদপত্র।
(IV) মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য ওয়ারিশদের অনুমতি ও ক্ষমতাপত্র।
এক্ষেত্রে ওই অনুমতি ও ক্ষমতা প্রদান পত্রটি একটি নির্দিষ্ট নমুনা ফর্মে পূরণ করে এলাকার মেম্বার এবং চেয়ারম্যান কর্তৃক/এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার কর্তৃক সিলমোহরসহ সই করিয়ে নিতে হবে।
(V) লাশ গ্রহণকারী ব্যক্তি, যাকে উত্তরাধিকার ক্ষমতা প্রদান করবেন তার মূল এনআইডি ও ফটোকপি অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে।
এর মধ্যে আপনাকে প্রবাসে নিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে এবং তার কাছ থেকে সেখানকার হাসপাতালের ‘রেজিস্টার অব ডেথ’-এর একটি কপি সংগ্রহ করতে হবে। এখন আপনি সেখানকার নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনার বরাবর আবেদন করবেন মৃতদেহ ফেরত পাঠানোর জন্য এবং সেই আবেদনে মৃত ব্যক্তির মরদেহ যিনি রিসিভ করবেন তার নাম, এনআইডি নম্বর, বিস্তারিত তথ্য ও ঠিকানা এবং মোবাইল নম্বর অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। হাইকমিশনারকে পাঠানো আবেদনের সঙ্গে অবশ্যই মৃতদেহ পাঠানোর জন্য ওয়ারিশদের অনুমতি ও ক্ষমতাপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
অতঃপর উভয় দেশের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হতে আপনাকে পাঁচ থেকে সাত দিন সময় দিতে হবে এবং আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পন্ন হওয়ার পর বাংলাদেশ হাইকমিশনারের অফিস থেকে মৃতদেহ গ্রহণ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং কবে নাগাদ কোন ফ্লাইটে, কোন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে পাঠানো হবে, তা বিস্তারিত অবহিত করবেন। পরে Funeral Services-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মরদেহ কোন এয়ারলাইনসের কার্গোতে আসবে, তার বিস্তারিত ফ্লাইট নম্বর উল্লেখ এবং বুকিং কনফারমেশন কপি আপনাকে পাঠাবে।
এখন প্রবাসে মৃত ব্যক্তির মরদেহ কোথা থেকে, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করবেন? এক্ষেত্রে সাধারণত বিমানযোগে আকাশপথে প্রতিদিন প্রচুর মরদেহ আমাদের বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বর্তমান যুগটা হলো সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। লাশ গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রচুর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে রয়েছে। আপনাকে এনআইডি কার্ডের মূলটি জমা প্রদান করে বিভিন্ন কাউন্টারে ঘুরে হয়রানির দিন এখন শেষ। অহেতুক ভিডিও দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। বাংলাদেশ সরকার এখন মৃত ব্যক্তির মরদেহ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের কল্যাণার্থে এবং জটিলতা এড়াতে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ কার্গো সেকশনের gate No. 08-সংলগ্ন একটি One Stop Service কেন্দ্র চালু করেছে।
ওই কেন্দ্রটি ৮নং গেটের বাঁ পাশে অবস্থিত দুই রুমের একটি একতলাবিশিষ্ট ভবন। একটি রুমে লাশ গ্রহণকারী ব্যক্তিরা অপেক্ষা করবেন, অর্থাৎ Waiting Room এবং অন্যটি হলো সেবাপ্রদান কক্ষ। সেবাপ্রদান কক্ষে তিনটি ডেস্ক রয়েছে, যার দুটি হলো বিমানের লাশবাহী কর্তৃপক্ষদের এবং অন্যটি হলো প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক।
আপনাকে প্রবাস থেকে C&F এর Booking Confirmation কপি পাওয়ার পর অন্য কারো দ্বারস্থ না হয়ে প্রথমে একটি লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে লাশবাহী গাড়িটিকে বিমান অবতরণের সময়ে gate No-08-এর পার্কিং জোনে উপস্থিত থাকতে বলবেন। সেইসঙ্গে আপনিও বিমান অবতরণের সময়ে এর আগে উল্লেখিত সব কাগজপত্রের তিন সেট, সঙ্গে অবশ্যই উত্তরাধিকারির NID-র ফটোকপি + লাশ গ্রহণকারী ব্যক্তির NID-র মূল কপি ও ফটোকপি প্রভৃতিসহ উপস্থিত হবেন।
অতঃপর আপনি ঙহব Stop Service-এর কার্গোর বিমান কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে নির্দিষ্ট ফর্ম (মরদেহ গ্রহণ-সংক্রান্ত) পূরণ করে স্বাক্ষর প্রদানপূর্বক জমা দেবেন। এরপর তারাই সব প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সম্পন্ন করবেন এবং আপনাকে লাশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলবেন। এক্ষেত্রে বিমান অবতরণের পর বিমান থেকে লাশ নামানো এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সব করণীয় সম্পন্ন করতে এক ঘণ্টা সময় লাগে।
এরপর লাশ আসা মাত্রই আপনাকে ডাকা হবে। মৃত ব্যক্তির মরদেহ আপনার লাশবাহী গাড়িতে দেওয়া হবে এবং আপনাকে আবার তাদের ডেস্কে গিয়ে লাশ গ্রহণ বইতে স্বাক্ষর প্রদান করতে হবে। এরপর কর্তৃপক্ষ আপনাকে Cargo Invoice-গুলো এবং লাশের সঙ্গে বিদেশ থেকে প্রেরিত একটি Sealed Envelope প্রদান করবেন। এই Sealed খামের মধ্যে থাকবে দুই সেট মূল কাগজ, যা—
(I) Ministry of Health Gi Permit to Export of Human Remains or Part thereof.
(II) Booking copy of cargo from Funeral Services.
(III) Hospital’s Death Certificate.
(IV) 2 copies of deceased person’s Passport.
(V) Register of Death-এর মূল কপি।
(VI) Embalming Certificate.
(VII) Letter of Bangladesh High Commission.
(VIII) Other related papers.
দ্বিতীয় ধাপে এই Sealed খামের কাগজপত্রসহ উপস্থিত হতে হবে ওই কক্ষেরই দ্বিতীয় ডেস্কে, অর্থাৎ প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে। এখানে আপনাকে প্রদান করতে হবে—
(I) মৃতদেহ গ্রহণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির NID-র ফটোকপি। মূলটা দেখালেই চলবে।
(II) মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের প্রত্যেকের ফটোকপি। সঙ্গে জন্মসনদ।
(III) মৃতদেহ বাংলাদেশ প্রেরণের জন্য ওয়ারিশদের অনুমতি ও ক্ষমতাপত্র।
(iv) Death Certificate-এর মূল কপি।
(V) Register of Death-এর মূল কপি।
(VI) Letter of Bangladesh High Commission.
এরপর মরদেহ গ্রহণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নির্ধারিত ফর্মে স্বাক্ষর এবং নির্ধারিত রেজিস্ট্রি বইতে স্বাক্ষর গ্রহণ করবেন। ওই রেজিস্ট্রি বইতে একজনের স্বাক্ষর প্রদান করতে হয়। অতঃপর বিমান কর্তৃপক্ষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির হাতে মরদেহ সুষ্ঠুভাবে দাফন-কাফন এবং পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য ৩৫,০০০ (পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা মাত্র) একটি A/C Payee চেক প্রদান করবেন। আগে যেখানে ৮নং গেট পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন কাউন্টারে যোগাযোগ করে গ্রহণকারী ব্যক্তিকে বিভিন্ন হয়রানিতে পড়তে হতো, এখন সেই বিড়ম্বনা থেকে মৃত ব্যক্তির পারিবার নিস্তার পেয়েছে। প্রবাসীদের জন্য এটা একটা বড় পাওয়া। সর্বশেষ চেক গ্রহণ করে মৃত ব্যক্তির মরদেহ নিয়ে আপনি নিজ গন্তব্যে যাত্রা করবেন।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post