একসময়ে বাংলার অর্থনীতির মূল স্তম্ভ ছিল পাটশিল্প। সোনালি আঁশখ্যাত এই পাটকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের অর্থনীতি পরিচালিত হতো। পাটশিল্প তার সেই জৌলুস হারিয়ে দুর্দশার সাক্ষী হয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। মূলত নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে ধুঁকতে হচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে। তবে আশার বিষয় হলো, পাটশিল্প আবারও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো লিজের মাধ্যমে পুনরায় চালুর সরকারি উদ্যোগ এ খাতে ইতিবাচক সাড়া সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যে একাধিক পাটকল চালু হওয়ায় উৎপাদন বাড়ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং রপ্তানিতেও উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ‘সোনালি আঁশ’ আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেÑ এমন প্রত্যাশা জোরালো হচ্ছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চালু হওয়া পাটকলগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিক কাজের সুযোগ পেয়েছেন এবং প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। আরও কয়েকটি মিল লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। এই উদ্যোগ সফল হলে বেকারত্ব হ্রাস, স্থানীয় অর্থনীতির চাঙাভাব এবং শিল্প খাতে গতি সঞ্চারÑ সবই একসঙ্গে সম্ভব।
তবে শুধু মিল চালু করলেই হবে নাÑ টকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। অতীতে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং বাজারসংকটের কারণে পাটকলগুলো লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। পাট ও পাটজাত পণ্য প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমেই গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে পণ্যের মান উন্নয়ন, বহুমুখীকরণ এবং ব্র্যান্ডিং জরুরি। ‘গোল্ডেন ফাইবার অব বাংলাদেশ’ হিসেবে পাটকে নতুনভাবে বিশ্বে উপস্থাপন করতে হবে।
একই সঙ্গে কৃষক পর্যায়ে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম হলে কৃষকের আগ্রহ কমে যাবে, যা পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে দুর্বল করবে। উন্নত বীজ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো এবং মান উন্নয়নেও জোর দিতে হবে। পাটশিল্প পুনরুজ্জীবনে শ্রমিকদের স্বার্থও উপেক্ষা করা যাবে না। তাদের বকেয়া পরিশোধ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে বিনিয়োগ বাড়ে এবং শিল্পটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়।
সর্বোপরি, পাটশিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও এটি এখনও এক সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। সঠিক নীতি, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নাও নিতে পারে। তাই এখনই সময়Ñ পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে গিয়ে পাটশিল্পকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাতে পরিণত করার। পাটশিল্পের উন্নয়নে দেশের অর্থনীতি যেমন গতি পাবে তেমনি পরিবেশের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখবে। তাই পাটশিল্পের দিকে আরও জোরালোভাবে নজর দিন, হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনুন।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post