আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বিনিয়োগবান্ধব হবে, এটাই প্রত্যাশা করি। বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বাজেটে এমন কিছু নীতি-সহায়তা থাকা জরুরি, যা দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। বাজেট যাতে দেশের বন্ধ থাকা কলকারখানা চালু করতে সহায়ক হয়, সেই প্রত্যাশা থাকবে। এ নিয়ে শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হুসাইন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেয়ার বিজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আনোয়ার হোসাইন সোহেল।
শেয়ার বিজ: আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কেমন বাজেট চান?
আলতাফ হুসাইন: আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বিনিয়োগবান্ধব হবে, এটাই প্রত্যাশা করি। বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বাজেটে এমন কিছু নীতি সহায়তা থাকা জরুরি, যা দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। বাজেট যাতে দেশের বন্ধ থাকা কলকারখানা চালুতে সহায়ক হয়, সেই প্রত্যাশা থাকবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য আলাদা প্রণোদনা ও কর রেয়াত দেওয়া যেতে পারে। বাজেটে যদি এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, সহজ শর্ত এবং ডিজিটাল ফাইন্যান্সিং সুবিধা বাড়ানো হয়, তাহলে বিনিয়োগ অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। আসন্ন বাজেটটি এমন হতে হবে, যা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে, ব্যবসায় আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং দেশের অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।
শেয়ার বিজ: জেড ক্যাটাগরি থেকে কবে এ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হবে ইসলামী ব্যাংক?
আলতাফ হুসাইন: ভালো ডিভিডেন্ড দিতে পারলেই আমরা আবার ‘এ’ ক্যাটাগরিতে যেতে পারব। ডিভিডেন্ড দিতে হলে লাভ করতে হবে, আর লাভ করতে হলে আয় বাড়াতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা বাস্তবভিত্তিক কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। এই আস্থা ধরে রাখতে হলে দৃশ্যমান ফলাফল দিতে হবে।
তবে কিছু প্রতিবন্ধকতাও আছে। একটি বড় অঙ্কের অর্থ একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের হাতে আটকে আছে, যেখান থেকে কোনো আয় আসছে না, বরং উল্টো দায় তৈরি হচ্ছে। এই গ্যাপ কাটিয়ে উঠতে বাকি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে আমরা লাভে ফিরতে চাই।
বর্তমানে নন-পারফর্মিং ইনভেস্টমেন্ট বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা রিকভারি বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছি। প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মতো নন-পারফর্মিং ইনভেস্টমেন্টকে যদি পারফর্মিংয়ে আনা যায়, তাহলে আমরা দ্রুত ইতিবাচক অবস্থায় যেতে পারব। এটা খুব কঠিন নয় বলে মনে করি।
শেয়ার বিজ: পুরোনো বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা ব্যাংকের আছে কি?
আলতাফ হুসাইন: বড় বিনিয়োগ আনতে হলে শেয়ার দিতে হয়। কিন্তু যেসব শেয়ার বড় গ্রুপের হাতে ছিল, সেগুলো এখন বাংলাদেশ ব্যাংক জব্দ করে রেখেছে। এসব শেয়ারের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকার ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর নির্ভর করবে নতুন বিনিয়োগকারীদের আনা সম্ভব হবে কি না। বর্তমানে আমাদের পক্ষে কাউকে সরাসরি অফার করার মতো শেয়ার নেই।
শেয়ার বিজ: বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে কারা আছেন, ব্যাংকটিতে তাদের ভূমিকা কী?
আলতাফ হুসাইন: ৫ আগস্টের পর নতুন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখানে সরকার মনোনীত এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাধীন পরিচালকরা আছেন। তারা কোনো শেয়ারহোল্ডার ডিরেক্টর নন, বরং পুরোপুরি ইন্ডিপেনডেন্ট বোর্ড হিসেবে ব্যাংক পরিচালনা করছেন।
শেয়ার বিজ: বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের পাঁচটি পজিটিভ ইন্ডিকেটর কী?
আলতাফ হুসাইন:
১. কমিটেড ও মোটিভেটেড জনবল: এটাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
২. এসএমই খাতে নেতৃত্ব: এই সেক্টরে আমরা আবার জোর দিচ্ছি, কারণ এখানে রিকভারি ভালো।
৩. রেমিট্যান্সে শীর্ষ অবস্থান: গত ১৮-১৯ বছর ধরে আমরা শীর্ষে। এ বছরও ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে।
৪. স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বোর্ড: বর্তমান বোর্ডের নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নেই, লক্ষ্য একটাইÑব্যাংককে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া।
৫. ইনভেস্টমেন্ট ফোকাস পুনর্গঠন: ঝুঁকি কমাতে এসএমইতে জোর দেওয়া হচ্ছে।
শেয়ার বিজ: আস্থার সংকট কাটাতে রি-ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ?
আলতাফ হুসাইন: ব্যাংকটি নিয়ে নানা নেতিবাচক প্রচারণা হলেও আমরা টিকে আছি, এটাই বড় সাফল্য। কোনো গ্রাহকই এখনো কাউন্টার বা এটিএম থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। রি-ব্র্যান্ডিং খুব ব্যয়বহুল বিষয়। তাই আপাতত মিডিয়ার মাধ্যমে ইতিবাচক তথ্য তুলে ধরাÑএটাই আমাদের রি-ব্র্যান্ডিং কৌশল।
শেয়ার বিজ: প্রভিশন ঘাটতি পূরণে কী পদক্ষেপ?
আলতাফ হুসাইন: প্রভিশন ঘাটতি একটি বাস্তব সমস্যা। বড় অংকের অর্থ আয়-উৎপাদনে আসছে না, ফলে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সহায়তা (ভড়ৎনবধৎধহপব) দিচ্ছে।
যদি আটকে থাকা বড় প্রকল্পগুলো আবার ব্যবসায় ফিরে আসে, তাহলে ব্যাংকের আয় বাড়বে এবং প্রভিশন ঘাটতিও ধীরে ধীরে কমবে।
শেয়ার বিজ: পাঁচ ব্যাংক একীভূত হওয়ায় কোনো সুবিধা পাচ্ছেন?
আলতাফ হুসাইন: আমরা বড় বিনিয়োগে খুব বেশি আগ্রহী নই। আমাদের ফোকাস এসএমই খাত। একীভূত ব্যাংকের ক্লায়েন্টদের সরাসরি নেওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আছে। তবে কেউ নিজ উদ্যোগে এলে আমরা গ্রহণ করছি। বিশেষ করে নন-ফান্ডেড সুবিধা, যেমন এলসিÑএসব ক্ষেত্রে আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি।
শেয়ার বিজ: চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠীর শেয়ারগুলোর বর্তমান অবস্থা?
আলতাফ হুসাইন: ব্যাংক এখন ‘জেড ক্যাটাগরি’তে রয়েছে, ফলে শেয়ার ওপেন মার্কেটে স্বাভাবিকভাবে লেনদেন হচ্ছে না। ভবিষ্যতে যদি এসব শেয়ার হস্তান্তর হয়, তখন বাজারদরের ভিত্তিতেই মূল্য নির্ধারিত হবে।
লাভে ফেরা, নন-পারফর্মিং ইনভেস্টমেন্ট কমানো, এসএমই খাতে জোর এবং গ্রাহক আস্থা পুনরুদ্ধারÑএই চার কৌশলেই ‘জেড’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ফেরার পথ খুঁজছে ইসলামী ব্যাংক।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post