নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কক্সবাজারের চকরিয়ায় ইটভাটার আগুনের উত্তাপে পুড়ছে শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ। উপকূলীয় ও পাহাড়ি জনপদে গড়ে ওঠা এসব ভাটায় শ্রম দিতে গিয়ে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক পরিবারের কোমলমতি শিশুরা। আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা আর নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তবে চকরিয়ার বিভিন্ন ভাটায় এখনো পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে শিশুশ্রমের বাস্তবতা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে৷
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ইটভাটায় কাজ চলে নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত। এ মৌসুমে শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। আর এই ব্যস্ততার সুযোগে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের পড়ালেখা বন্ধ করে ভাটায় কাজে নামিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা চুক্তিতে কাজ করতে এসে শিশুদেরও সাথে নিয়ে আসেন। ইট উলটে দেওয়া, রোদে শুকানো কিংবা ইট বহনের মতো ভারী কাজে শিশুরা তাদের শৈশব বিলীন করছে। ভোরে যখন শিশুদের স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, তখন এখানকার দরিদ্র পরিবারের শিশুরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীর নিচে।
স্থানীয় কয়েকটি পরিবারের একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মৌসুমের আগেই সমবায়-ভিত্তিক অর্থ দেওয়া হয় স্থানীয় দরিদ্র পরিবারগুলোকে। ফলে মৌসুমে ইটভাটায় কাজের চাপ থাকে বেশি। কাজের টার্গেট পূর্ণ করতে ইটভাটার তপ্ত উঠানে সপরিবারেই নামতে হয়। এতে বাদ যায় না ৬-১৮ বছরের কোনো শিশুই।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় প্রাথমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায়। বছরের প্রায় ছয় থেকে সাত মাস ভাটায় কাজ চলায় এই শিশুরা স্কুল থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তারা ক্লাসের পাঠ্যক্রম ধরতে পারে না, এবং একপর্যায়ে মেধা ও আগ্রহ হারিয়ে স্থায়ীভাবে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। শিক্ষকরা বলছেন, মৌসুমি এই ঝরে পড়ার হার এতই বেশি যে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে।
ইটভাটা সিন্ডিকেটের প্রভাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, কাজের চাপে স্কুল থেকে বাবা-মা শিশুদের নিয়ে গিয়ে কাজে দেওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটে। সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকলেও তা কাজে আসে না এসব অঞ্চলে। স্কুলগুলোর পক্ষ থেকে সচেতনতার কাজ করলে বিভিন্নভাবে হুমকি আসে। এতে স্কুলে উপস্থিতি বাড়াতে এক প্রকার অসহায় শিক্ষকরাও।
চিকিৎসকদের মতে, আগুনের তাপ আর ধুলাময় পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ফলে এই শিশুরা প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে ভুগছে। এর ফলে তাদের স্বাভাবিক মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেকে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহীন দেলোয়ার জানান, শিশুশ্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। ইটভাটার অনুমোদন থাকলেও সেখানে শিশুশ্রম করানো যাবে না। এমন হলে আমরা প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেব। আর পরিবার ও অভিভাবকদের নিয়মিত সচেতন করা হয়, যাতে বাচ্চাদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলেন।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post