মীর আনিস : ১৫ বছর আগেও বাংলাদেশ ছিল একটি তরুণ রাষ্ট্র, যেখানে শুধু রূপের বদল নয়, মানুষের স্বপ্নও উজ্জ্বল ছিল। শহর থেকে গ্রাম, বস্তি থেকে স্কুল, হাসপাতাল থেকে আদালত—সবখানে ছিল উন্নতির প্রত্যাশা। স্বপ্ন ছিল উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার, যেখানে সবাই সুস্থ থাকবে, সুশিক্ষিত হবে, ন্যায় বিচার পাবে এবং সংবাদমাধ্যম সৎ ও নির্ভীক হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ এক বেদনার গল্পে রূপ নিয়েছে।
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মঞ্চে যেভাবে ঝলমল করেছে, তা বিশ্বদরবারে অনন্য উদাহরণ। জিডিপি বার্ষিক ছয় থেকে সাত শতাংশের ঊর্ধ্বে, রপ্তানি বেড়ে গেছে, বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে, বিদেশি মুদ্রার মজুতও অনেকগুণ বেড়েছে। এসব গড়গড়া সংখ্যার পেছনে ছিল কোটি মানুষের প্রতিশ্রুতি, আশা এবং কর্ম। তবে সেই উন্নয়নের ছায়ায় লুকিয়ে ছিল দেশের মানুষের মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়, যা এখন সমাজের নানা দিককে আক্রান্ত করেছে। মূল্যবোধের অবনতি এক রহস্যময়, ধ্বংসাত্মক ছড়াছড়ি হয়ে উঠেছে—যেখানে পেশাদারিত্ব হারিয়েছে তার প্রাণ, সততা হারিয়েছে তার মান। শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও সাংবাদিকরা, যারা একসময় দেশের শ্রেষ্ঠতম প্রতিফলন, আজ তারা নীতিহীন, স্বার্থপর ও লোভী পেশাজীবী। যাদের সব থাকলেও নেই কোনো মানসম্মান। আর এই গল্পের পেছনে রয়েছে এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক শাসনের অন্ধকার দিক; একটি শাসন ব্যবস্থা, যা পেশাদারদের রাজনৈতিকীকরণ ও দালালিতে ঠেলে দিয়েছে।
শুরুতেই দেখা যাক, পেশাদারদের আচরণ কী হওয়া উচিত। শিক্ষকের কাঁধে শুধু পাঠদান নয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিশাল দায়িত্ব। তিনি যেন শুধু জ্ঞান নয়, চরিত্রও গড়ে তোলেন। শিক্ষক অবশ্যই রাজনৈতিক স্বার্থ ত্যাগ করে ক্লাসরুমকে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিণত থেকে রক্ষা করবেন। চিকিৎসকরা রোগীর স্বাস্থ্যে নিবেদিত থাকবেন। অথচ তারা যদি পেশাকে অর্থ আয়ের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে সততা ও নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে সরকারি দালালিতে ব্যস্ত থাকে তাহলে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইনজীবীরা যদি নিরপেক্ষতা ভুলে নিজের সুযোগ-সুবিধার জন্য ন্যায় বিচারকে উপেক্ষা করে কেবল সরকারি দালালিতে ব্যস্ত থাকেন তাহলে ন্যয়বিচার ব্যাহত হবে। সমাজে শৃঙ্খলা থাকবে না আর সাংবাদিক, যিনি সত্যের দ্যুতি প্রজ্বলিত করেন, যদি লোভ, স্বার্থ আর ক্ষমতার দম্ভে ইয়েসম্যান সাংবাদিকে পরিণত হয়ে উন্নয়ন সাংবাদিকতা শুরু করেন। সরকারের সমালোচনার বিপরীতে তেলবাজি করেন, তাহলে তার সাংবাদিকতার মূল্য কী? এভাবে সব পেশায় লোভ আর স্বার্থের কারণে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা হারালে দেশ চলে যাবে রসাতলে। গত ১৫ বছরে যেটা হয়েছে। পেশাজীবীরা চক্ষুলজ্জা হারিয়ে এক আজব মানুষে পরিণত হয়েছে।
মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের গুরুত্ব সমাজের স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং উন্নয়নের মূলে। এগুলো ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু সংখ্যার খেলা, যা দ্রুত ঘুরে যায়। একটা উদাহরণ দিতে পারেন—চিকিৎসার ক্ষেত্রে নৈতিকতা রোগীর জীবন রক্ষা করে এবং শিক্ষায় নৈতিকতা একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ দুর্নীতি ও মূল্যবোধহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, সেখানে পেশাদারিত্বই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এই প্রতিশ্রুতি ছাড়া উন্নয়ন একদিন ধূলিসাৎ হবে।
তবে বাস্তবের কাহিনি অনেক ভয়াবহ। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, বিচার ও সাংবাদিকতায় যা ঘটেছে ভয়াবহ অবক্ষয়। শিক্ষকরা পাঠদান নয়, দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মানুষ গড়ার কারিগররা ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজেদের আখের গোছাতে। ফলে শিক্ষার্থীরা আধুনিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় কোনো পর্যায়েই উন্নত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় আমাদের শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞানে দুর্ভিক্ষ, শিক্ষায় অবক্ষয়, ছাত্রছাত্রীর মেধা চাপা পড়ে কেবল টিউশন ও কোচিংয়ের ওপর।
স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংসের শিখরে। হাসপাতালগুলোয় অভাব, দুর্নীতি ও আত্মসাৎ প্রতিদিনের গল্প। চিকিৎসকদের দুর্নীতির অভিযোগ আরেক দিগন্ত খুলে দেয়, যেখানে রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। মহামারি সময়েও ঘুষবৃত্তি-দলীয় রাজনীতির বলি রোগীরা। এই সিস্টেমে আত্মসমর্পণ করে স্বাস্থ্যসেবা বিপর্যস্ত হয়।
বিচারব্যবস্থাও অতীতের ছায়া। যেখানে আইনজীবীরা দলীয় দোসর হয়ে গিয়ে ন্যায় বিচারের স্বাধীনতা কবর দেয়া হয়। বিচারকরা দুর্নীতির খাতিরে সমাজের আস্থা হারায় এবং রাজনৈতিক প্রভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। এই চরিত্রহীনতা সমাজের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ভয়ানক অবস্থা। দালাল সাংবাদিকরা সরকারি সুবিধা নিয়ে রাতারাতি অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যান। অনেকেই মিডিয়ার মালিক বনে যান। এদের দেখাদেখি লোভের বলি হয়ে কয়েকশ সাংবাদিক পেশাদারিত্ব ভুলে দালালিতে নাম লেখান। অপরদিকে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অপব্যবহার, গোয়েন্দা সংস্থার খবরদারির কারণে থেমে যায় অনেক পেশাদার সাংবাদিকদের কলম। ফলে সরকার ও জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়। দালালি গণমাধ্যমের কারণেই হাসিনা সরকার তার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।
সব মিলিয়ে ওই সময়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেখ হাসিনার রাষ্ট্র শাসন শৈলীর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ও তৃতীয় বিশ্বের অনেক নেতার দৃষ্টান্ত মিল রয়েছে। শাসনের একনায়কতাই এই পেশাদারদের পতনের মূল কারণ। শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুয়ে, সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশে দেখা যায়, যেখানে দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয় অর্থনৈতিক ধ্বংসের প্রধান কারণ। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার দেউলিয়া হওয়ার পেছনে সরকারি দুর্নীতি, পেশাদারদের রাজনৈতিকীকরণ এবং অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ছিল। জিম্বাবুয়ে, সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলা একই পথে চলায় যেখানে বিচার ও সংবাদমাধ্যম নিয়ন্¿ণে রেখে সমাজের বুনিয়াদি প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশও এখন এমন একটি সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।
এই কাহিনি শুধুই বাংলাদেশ বা শেখ হাসিনার নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা, যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক নিয়ন্¿ণ এবং পেশাদারদের প্রয়োজনের বাইরে রাজনৈতিক দাসত্ব দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। পেশাদাররা তাদের সততা ও পেশাদারিত্বের জন্য দাঁড়াতে হবে, মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষকরা ছাত্রদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে, চিকিৎসকরা রোগীর অধিকার রক্ষা করবে, আইনজীবীরা নিঃস্বার্থ ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে, আর সাংবাদিকরা সাহসিকতায় সত্য প্রকাশ করবে। এই চার স্তম্ভ ছাড়া কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে ব্যর্থ হবে।
বাংলাদেশের এই মহাকাব্যিক গল্পের পরবর্তী অধ্যায়টি হবে পেশাদারদের গভীর আত্মসমালোচনা ও পুনর্জাগরণের। সততার আলো জ্বালিয়ে দেশের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে দেয়া হবে ন্যায়ের এবং মানবতার বাতিঘর। আর তবেই আসবে প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যেখানে মুদ্রার ঊর্ধ্বগতি শুধু টেবিলের ওপরের সংখ্যা নয়, বরং প্রতিটি মানুষের জীবনের উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। পেশাদারিত্বের পুনর্জন্ম ছাড়া বাংলাদেশের এই গল্প হবে শুধু একটি বলাবলি, বাস্তবে নয়।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post