চট্টগ্রাম ব্যুরো: বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তাভাত আর ভাজা ইলিশ, কিন্তু এবার বন্দরনগর চট্টগ্রামের বাজারে ইলিশের দাম এমন উচ্চতায় উঠেছে যে, রুপালি এই মাছটি এখন আর উৎসবের থালায় নেই— পরিণত হয়েছে বিলাসিতার প্রতীকে। চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ কম থাকায় ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশ এখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে। সপ্তাহ ব্যবধানে ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। জ্বালানি তেলের সংকট ও নিষেধাজ্ঞার কারণে বাজারে ইলিশের সরবরাহে প্রভাব পড়েছে বলে দাবি বিক্রেতাদের। তবে মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছর চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণ হয়েছে আগের বছরের চেয়ে অনেক বেশি।
গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার, রিয়াজুদ্দিন বাজার, বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার, ঘুরে দেখা গেছে, ইলিশের দামে রীতিমতো আগুন লেগেছে। ক্রেতার ভিড় না থাকলেও বিক্রেতারা দামে এক পয়সাও ছাড় দিচ্ছেন না। মাঝারি থেকে বড় আকারের ইলিশ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। তারা জানান, ঐতিহ্যের টানে ইলিশ কিনতে এলেও দাম বেড়ে যাওয়ায় আর সবার পক্ষে কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বিক্রেতা বলছেন, নববর্ষের আগে প্রতি বছরই ইলিশের চাহিদা বাড়ে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। একদিকে জাটকাসহ সব মাছ রক্ষায় পদ্মা- মেঘনাসহ দেশের ছয়টি নদী অঞ্চলে দুই মাসের মৎস্য নিষেধাজ্ঞা চলছে। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে আরও ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকটে অনেক জেলে গভীর সাগরে নৌকা ভাসাতে পারছেন না। সব মিলিয়ে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। আর এই সরবরাহ সংকটের ঠিক মুখে বৈশাখ ঘিরে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দামের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। বাজারে বর্তমানে ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। ছোট আকারের ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ইলিশের দাম ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, কোথাও কোথাও ২ হাজার ২০০ টাকাও চাওয়া হচ্ছে।
৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা । ক্রেতাদের ভাষ্য, বৈশাখ মানেই পান্তা- ইলিশ—এই ধারণা এখনও শক্তিশালী। কিন্তু বাড়তি দামের কারণে সেই ঐতিহ্য অনেকের জন্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। চকবাজারে মাছ কিনতে আসা সেলিনা বেগম বলেন, প্রতি বছরই পহেলা বৈশাখের জন্য ইলিশ কিনে থাকি। একই ধারাবাহিকতায় এবারও আমি মাছ কিনতে এসেছি। কিন্তু একদিকে যেমন পছন্দ অনুযায়ী মাছ পাচ্ছি না, আবার দামও কেজি প্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি রাখছে। সিন্ডিকেট করে বাজারে আমদানি কমিয়ে মাছের দাম বাড়িয়ে দিছে কিনা সরকারকে দেখার অনুরোধ রাখছি। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান রিয়াজুদ্দিন বাজারে ইলিশ মাছ কিনতে আসা তাজিম আশ্রাফ। তিনি বলেন, ৮০০ গ্রাম ওজনের পাঁচ কেজি ইলিশ মাছ কিনেছি ২৪০০ টাকা কেজি দরে । বৈশাখকে ঘিরে প্রতিবছরই মাছ কিনতে হয়। কিন্তু এ বছর আমার কাছে মাছের দাম অনেক বেশি মনে হয়েছে। বাজারে মাছের সরবরাহও কম মনে হয়েছে আমার ।
বিক্রেতারা অবশ্য বলছেন, দাম বাড়ার পেছনে তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। রিয়াজুদ্দিন বাজারের মাছ
বিক্রেতা হাসান আলী বলেন, জেলেরা খুবই কম মাছ পাচ্ছে জালে যে কারণে এ বছর মাছের আমদানি খুবই কম। বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেশি থাকলে আমরাও কম দামে মাছ বিক্রি করতে পারতাম। বৈশাখকে কেন্দ করে প্রতি বছরই মাছের চাহিদা বেশি থাকে এবং দামও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে। কিন্তু এ বছর বাজারে মাছের আমদানি কম থাকায় ইলিশের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের মাছ বিক্রেতা শামীম হোসেন বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইলিশের দাম কেজিতে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর মাছের আমদানি কম। জেলেরাও নদীতে আগের মতো মাছ পাচ্ছে না। বর্তমানে ক্রেতার সংখ্যাও খুবই কম।
তবে মৎস্য বিভাগের তথ্য ভিন্ন চিত্রও তুলে ধরছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে চট্টগ্রাম উপকূলে যে পরিমাণ ইলিশ আহরিত হয়েছে, তা আগের বছরের মার্চের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। সামগ্রিকভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ বেশি হয়েছে প্রায় আড়াই গুণ।মৎস্য দপ্তর জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ইলিশ আহরিত হয়েছিল ১ হাজার ৫৫৭ টন। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। মার্চ মাসে প্রায় ১৬৭ টন ইলিশ ধরা পড়েছে কুতুবদিয়া চ্যানেল ও সাঙ্গু নদে। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা, হালিশহর, কাট্টলীসহ উপকূলীয় এলাকায় জেলেরা সাগরে মাছ ধরেন । এ ছাড়া সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা ও বাঁশখালীর জেলেরাও সাগরে মাছ শিকার করেন। মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, মার্চে ইলিশ আহরণ ভালো থাকায় এবার বৈশাখে বাজারে দাম কিছুটা কম থাকার কথা। তবে আহরণ করা বেশির ভাগ মাছ আকারে ছোট। মৎস্য অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন জানান, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি সময়ে সাগরের চেয়ে নদীতে ইলিশ আহরণ কিছুটা কমেছে। তবে নদীতে প্রচুর পরিমাণে জাটকা রয়েছে। সংরক্ষণ করা গেলে আগামী মৌসুমে নদীতেও ইলিশ উৎপাদন বাড়বে। নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভরাট, পানিদূষণ এবং অতিরিক্ত আহরণ দায়ী।
চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বোট মালিক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব মো. ইসমাইলের দাবি, ইলিশের আহরণ তেমন বাড়েনি। সরকারি হিসাবের সঙ্গে জেলেদের হিসাব মেলে না। ফলে দামও সেভাবে কমেনি। আড়তেই এখন ছোট আকারের ইলিশ কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাজার নজরদারিতে মাঠে নেমেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থার উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ জানান, বৈশাখকে ঘিরে ইলিশের সরবরাহ ও দামের ওপর কড়া নজরদারি রয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী বা আড়তদার মজুত করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে । কিন্তু তাতে এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের সংকট কতটা কাটবে, সেটাই প্রশ্ন। যে মাছ একদিন ছিল গরিবের পাতেও পরিচিত অতিথি, সেই ইলিশ আজ ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বিলাসিতার প্রতীক। পহেলা বৈশাখের পান্তার থালায় ইলিশের জায়গা নেবে কী—সেই প্রশ্নটাই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে চট্টগ্রামের বাজারে বাজারে ।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post