নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন থেকে নিয়মিত অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংগঠনের সদস্য ননÑএমন অনেক কর্মকর্তার কাছ থেকেও তাদের সম্মতি ছাড়াই প্রতি মাসে ৩৫০ টাকা করে কর্তন করা হচ্ছে। যদিও কাউন্সিলের নির্ধারিত চাঁদা মাত্র ৭০ টাকা বলে জানিয়েছেন বিবিও এর সংশ্লিষ্টরা। সেখানে নন-মেম্বারদের কাছ থেকে ৩৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রায় ২০০ কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রতি মাসে এই হারে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। সে হিসাবে মাসে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা। বছরে যার পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি সংগঠনের কার্যক্রম, তহবিল ব্যবস্থাপনা কিংবা সদস্যদের সম্মতির বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও অনেকের বেতন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের দাবি, ব্যক্তিগত সম্মতি ছাড়া বেতন থেকে অর্থ কর্তন করা শুধু অনৈতিকই নয়, এটি কর্মচারীদের আর্থিক স্বাধীনতার ওপরও হস্তক্ষেপ।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কেউ কেউ এই সংগঠনের সদস্যই নই। তারপরও প্রতি মাসে বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে মৌখিকভাবে আপত্তি জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।’
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরেই যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থার কথা সহজেই অনুমান করা যায়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিব্রতকর।’
অভিযোগ রয়েছে, ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নামে এই অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নীতিমালা কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। অনেকেই জানেন না তাদের বেতন থেকে কী কারণে এবং কোন প্রক্রিয়ায় অর্থ কাটা হচ্ছে। এ ছাড়া আদায়কৃত অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে কিংবা এর কোনো নিরীক্ষা প্রতিবেদন রয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে অসন্তোষ দিন দিন বাড়ছে।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা অবিলম্বে এ ধরনের অর্থ কর্তন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, কোনো সংগঠনে সদস্যপদ গ্রহণ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। সেখানে জোরপূর্বক অর্থ আদায় কিংবা অনুমতি ছাড়া বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তারা আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের উদাহরণ সৃষ্টি হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে যদি কর্মকর্তারাই এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের শিকার হন, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির জন্যও নেতিবাচক বার্তা বহন করে।প্রথম পৃষ্ঠার পর
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ শেয়ার বিজকে বলেন, কাউন্সিলের নামে কোনো ব্যক্তিগতভাবে টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। সদস্যদের কাছ থেকে যে অর্থ কাটা হয়, তা বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নির্ধারিত অ্যাকাউন্টেই জমা হয়।
তিনি বলেন, সদস্য না হলে কারও বেতন থেকে অর্থ কাটার সুযোগ নেই। যারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, তারা সবাই কাউন্সিলের সদস্য বলেও দাবি করেন তিনি। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে নির্দিষ্ট তালিকা দিলে তিনি যাচাই করে দেখবেন কার টাকা কাটা হয়েছে, কোথায় গেছে এবং পুরো বিষয়টি কীভাবে হয়েছে।
মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে মাসিক ৭০ টাকা হারে চাঁদা নেওয়া হয়। সেখানে ৩৫০ টাকা কীভাবে নেওয়া হয় বিষয়টি মাথায় আসছে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগকে গুরুতর উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, বিষয়টি গভর্নরের নজরে এলে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, আমিও অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সদস্য। একইভাবে আমার টাকাও তো কেটে নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কারও কাছ থেকে জোর করে অর্থ কেটে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো কর্মকর্তা সম্মতি না দিলে তার বেতন থেকে টাকা কর্তন করা সম্ভব নয়। তবে বিশেষ কোনো প্রয়োজনে, যেমন কোনো সহকর্মীর চিকিৎসা সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সম্মতিপত্রের ভিত্তিতে বেতন থেকে টাকা কাটা হতে পারে।
নিয়মিতভাবে অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ যদি সম্মতি না দিয়ে থাকেন, তাহলে আপত্তি তুললে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। এরপরও অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post