আবু আফজাল সালেহ: ১৯ এপ্রিল থেকে জ্বালানি-তেলের বর্ধিত দাম কার্যকর হয়েছে। একলাফে অনেক বেড়েছে অক্টেন, পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম। কয়েকদিন আগে বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। বৈশ্বিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এ সংকট দাম বাড়িয়ে নিরসনের চেষ্টা সরকার করছে। এটি মোটামুটি বেশ ভালো উদ্যোগ। অনেক দেশে আগেই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। সংকট আসলে বিশ্বব্যাপীই। তবে, তেল সংকট পরবর্তীতে মূল্যবৃদ্ধি ভবিষ্যতেই বাড়িয়ে দেবে অন্যান্য সংকটকে। মূল্য বেড়ে যাবে সব জিনিসের, খরচ বাড়বে যাতায়াত ও পরিবহনে। মূলত, এ কারণেই সবকিছুতেই অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। আর সবকিছুতেই সিন্ডিকেট তো আছেই! সিন্ডিকেট সংকট বাড়িয়ে দেয় অস্থিরতা আর উত্তেজনা। বাংলাদেশে সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে, অনেকসময় সরকারও অসহায় হয়ে পড়ে। আবেগী জনগন নিজেরটা বুঝে চুপ থেকে বিভিন্ন সংকটকে দৃশ্যমান করিয়ে বাড়িয়ে দেয়। এ প্রবণতা সবস্ময়ই চলে। কোথায় নেই সিন্ডিকেট? শিক্ষা-স্বাস্থ্য-ব্যবসা-চাকরি প্রভৃতি ক্ষেত্রে চলছে এ কৃত্রিম সিস্টেম।
জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে অন্যান্য সংকটকে। জীবাশ্মজ্বালানি সংকট করোনার সময়ের মতো, ধাক্কাটি একসঙ্গে নয় বরং ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পাবে। এবং বিভিন্ন সংকট জাগিয়ে দিয়ে বৃহত্তর সংকট সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বের এ অস্থিরতা কতদিন থাকবে তা বলা যাচ্ছে না। একটি সুখবর পেতে না পেতেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেতিবাচক খবর ভাবিয়ে তুলছে। অর্থনীতি ও শেয়ার বাজার হুমকির মুখে। জ্বালানি তেল সংকট কার্যত আমেরিকা-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধকে বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বারবার পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত অস্থিরতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ তেল সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে অন্যান্য সংকটকে, আবার নতুন করে কিছু সংকট সৃষ্টিও হচ্ছে।
ইরানে যুদ্ধের এক মাস পর, অপরিশোধিত তেলের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি আরও খারাপ কিছুতে রূপ নিতে হুমকির পর্যায়ে; প্রায় সবকিছুর ঘাটতি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রবাহকে সংকুচিত করেছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহকে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমিয়ে দিয়েছে। এই বিঘ্ন শুধু জ্বালানির দামকে আকাশচুম্বী করেছে না, বরং প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পেট্রোকেমিক্যালের সরবরাহকেও সংকুচিত করেছে, যেমন জুতা, পোশাক এবং পাস্টিকের ব্যাগ। সেই চাপ এখন ভোক্তা বাজারের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ প্লাস্টিক, রাবার এবং পলিয়েস্টারের মতো উপকরণের দাম বাড়ছে। এটির প্রভাব এ পর্যন্ত এশিয়ায় সবচেয়ে স্পষ্ট, যা বিশ্বের উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি অংশ দখল করে এবং তেল ও অন্যান্য পণ্যের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পোশাক ও প্লাস্টিক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশও হুমকির মুখে পড়বে সম্ভাবনাময় এ দুই শিল্প। কর্মসংস্থান হারাতে পারেন অনেকে। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে এটাও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের নড়েচড়ে বসতে হবে। বিকল্প উপায় খুঁজতে কিংবা বের করতে হবে।
তাইওয়ান প্লাস্টিকের অভাবের কারণে প্রস্তুতকারকদের জন্য একটি হটলাইন শুরু করেছে। জাপানে, তেল সংকটের ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি-ব্যর্থতায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হেমোডায়ালিসিসের জন্য ব্যবহƒত প্লাস্টিকের চিকিৎসা টিউবের অভাব দেখা দিয়েছে। মালয়েশিয়ার গ্লাভ প্রস্তুতকারকরা বলেছেন, রাবার ল্যাটেক্স তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় একটি পেট্রোলিয়াম উপপ্রাপ্তির অভাব বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা গ্লাভের সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলছে। পণ্য এবং উৎপাদনের মধ্যে অস্থিরতা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপর ভারী প্রভাব ফেলছে। প্রস্তুতকারকরা শক্তি এবং কাঁচামালের জন্য বেশি টাকা দিচ্ছেন, যা লাভের মার্জিনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়াতে শুরু করছে। বাড়তি জ্বালানির খরচ ভ্রমণ এবং লজিস্টিককে বিপর্যস্ত করছে, যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে অন্যান্য উপকরণের সংকট, যেমন সার এবং হিলিয়াম, খাদ্য এবং ইলেকট্রনিক্সের দাম বেড়ে যাবে। থাইল্যান্ডের রেস্তোরাঁ,খাবারের দোকান এবং টেকআউট ডেলিভারির জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহƒত স্বচ্ছ সেলোফেন ব্যাগের দাম ১০% বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া রিপোর্ট করেছে যে বোতলজাত পানির দাম বাড়ছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্লাস্টিকের বোতল ঢাকনার দাম চারগুণ বেড়ে গেছে। এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় ইনস্ট্যান্ট নুডল প্রস্তুতকারক নংশিম বলেছে যে, তাদের প্লাস্টিক প্যাকেজিং সরবরাহকারী কোম্পানির কাছে বর্তমানে প্রায় এক মাসের সরবরাহ অবশিষ্ট রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে প্রায় ১৭% ন্যাফথা এবং ৩০% প্লাস্টিক রেজিন উৎপাদনের পাশাপাশি ৪৫% সালফার সরবরাহ করে, যা সার তৈরিতে ব্যবহƒত হয়, ৩৩% হেলিয়াম, যা সেমিকন্ডাক্টর, স্বাস্থ্যসেবা এবং মহাকাশে ব্যবহƒত হয়, এবং ২২% ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া, যা ফসলের পুষ্টির জন্য ব্যবহƒত হয়। মার্কিন কৃষকরা ইতোমধ্যেই সারের জন্য বেশি মূল্য পরিশোধ করছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমদানি করা ইউরিয়ার দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে, এশিয়ার দেশগুলো তেলের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে মনোনিবেশ করেছে, যেমন তেল মজুত মুক্ত করা, জ্বালানির দাম সীমাবদ্ধ করা এবং শক্তি সাশ্রয়ের জন্য কাজের ঘণ্টা কমানো ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এপ্রিল মাসের পর থেকে আরও তীব্র হবে। কারণ, যুদ্ধের আগে পাঠানো শেষ অপরিশোধিত তেল এই মাসের শুরুতে পৌঁছানোর কথা। চীনের অনেক স্থানের কাপড় তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পলিয়েস্টার চিপের দাম প্রায় ৫০% বেড়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়ায়, যেখানে গত মাসে (মার্চ) প্লাস্টিকের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ান প্যাকেজিং ফেডারেশনের মতে, কাগজ, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম বা পুনর্ব্যবহƒত প্লাস্টিকের মতো বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের কথা ভাবছে। প্লাস্টিকের বিকল্পগুলিতে ফিরে আসা দরকার। এমন সব জটিল প্রভাব আমাদের অর্থনীতির জন্য আঘাতের সহ্যসীমা সীমিত করে দেবে।
করোনা জটিলতা একবারেই ধ্বংস ঢেকে আনলেও তেলসংকট বিভিন্ন সংকটকে ধীরে ধীরে ভয়ংকরের দিকে নিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী যে সংকটগুলোর কথা আলোচনায় এসেছে, সবগুলো সংকটই বাংলাদেশে হবে, কিছুদিনের মধ্যেই। এর বাইরেও অনেক সংকট বা জ্বালা ছড়িয়ে পড়বে। জ্বালানি সংকট নিরসনে অবহেলার সুযোগ নেই। সংকট নিরসনে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। গণছুটিও একটি কার্যকরী পদক্ষেপ হতে পারে, সেটা কয়েক সপ্তাহ অথবা সপ্তাহে একদিন কিংবা দুদিন পর্যন্ত আরও ছুটি। সিন্ডিকেট, গুজব ও অপতথ্য সরবরাহ ও প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে অবহেলা না করে অতি কঠোর হতে হবে। উদাসীন কিংবা অবহেলা সরকার পতনের গোড়াপত্তন বা ভিত্তি গড়ে দিতে পারে। পচা শামুকে যেন পা না কাটে। তারজন্য ব্যবস্থা সময়ে সময়ে এখন থেকেই শুরু করতে হবে। অবহেলা নাÑ করে এসবের এখনই লাগাম ধরে টানতে হবে। সমালোচনা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু অপতথ্য কিংবা গুজব ছড়ানো একটুও বরদাস্ত করা যাবে না। সিন্ডিকেট বিষয়ে নমনীয় কিংবা উদাসীন হলে কিংবা বাস্তবায়ন নাহলে সরকারকে পস্তাতে হতে পারে। সরকারকে এখনই দুর্বল করে দিতে চাচ্ছে কেউ কেউ। এ বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সরকার যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে ততই মঙ্গল হবে দেশের জন্য, সরকারের জন্য। হরমুজ প্রণালিতে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেলেও কিছু খাতের জন্য এশিয়ায় স্বাভাবিক হতে অন্তত কয়েক বছর সময় লাগবে। তাই, মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুক্তিযুক্ত সমাধানে আনার জন্য সবপক্ষকেই আন্তরিকভাবেই এগিয়ে আসা দরকার বলে মনে করি।
দেশের যেকোনো সংকটে অসাধু ব্যাবসায়ী ও সিন্ডিকেট সুযোগের সন্ধ্যান করে। অথচ, বিদেশে দেশের বিভিন্ন সংকটে সবাই সংকট-নিরসনের চেষ্টা/সহযোগিতা করে থাকে। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। সিন্ডিকেট যেকোনো সংকটকে বাড়িয়ে দেয় কিংবা সংকট তৈরি করে। জ্বালানি তেল নিয়ে সিন্ডিকেট, সুবিধাভোগী ভোক্তা অবৈধ মজুত করে সংকট তৈরি করে এখন বৃহত্তর সংকটে রূপান্তর করেছে। সরকার অনেক কিছু করে সংকট নিরসন করার চেষ্টা করছে। সরকারকে সঠিক তথ্য প্রচার করে জনগণের সযোগিতা চাওয়া দরকার। আর তেল-গ্যাস প্রভৃতি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত ও অনমনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতি জরুরি। নাহলে, পচা শামুকে পা কেটে দিতে পারে। পাশাপাশি, সংকট নিরসনে কার্যকরী কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করাও জরুরি।
কবি ও প্রাবন্ধিক
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post