বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম শক্তিশালী উপখাত নিটশিল্প আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। জ্বালানি তেলের ঘাটতি এবং দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বিএকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা, কোথাও কোথাও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে কারখানাগুলো তাদের নির্ধারিত উৎপাদন সময় বজায় রাখতে পারছে না। বিশেষ করে ভালুকা, শ্রীপুর ও রাজেন্দ্রপুরের মতো পল্লী বিদ্যুৎনির্ভর শিল্প এলাকায় পরিস্থিতি আরও নাজুক। যেখানে একটি কারখানা দৈনিক ১০ ঘণ্টা উৎপাদন চালানোর কথা, সেখানে বিদ্যুৎ সংকটে সেই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতির কারণে বহু কারখানা এখন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে শুধু উৎপাদনই কমছে না, রপ্তানি আয়ও ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হলে এ খাত থেকে বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় অর্জন করা যেত।
অন্যদিকে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য আদায় করা যাচ্ছে না। বিদেশি সংস্থাগুলো শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে কঠোর নজরদারি চালালেও পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে উদ্যোক্তারা একপ্রকার দ্বৈত চাপে পড়েছেনÑ একদিকে বাড়তি খরচ, অন্যদিকে কম আয়ের বাস্তবতা।
এই সংকট কেবল একটি শিল্প খাতের সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সতর্ক সংকেত। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। সেই খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যদি ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে এর প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। অতএব, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাস্তবভিত্তিক চিন্তা করলে বোঝা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে লোডশেডিং থেকে একেবারে বের হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সরকার আন্তরিক হলে নানা কৌশলে শিল্প কারখানায় লোডশেডিং কমিয়ে আনা যায়। সেক্ষেত্রে সরকারকে এই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। শিল্প কারখানাগুলোকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখতে হবে।
কারখানাকে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিল্পবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
নিট শিল্পকে টিকিয়ে রাখা মানে শুধু একটি খাতকে রক্ষা করা নয়, বরং দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে সুরক্ষিত রাখা। এখন দেখার বিষয়Ñ এই সংকট মোকাবিলায় কত দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মনে রাখতে তৈরি পোশাক শিল্প আমাদের দেশের অর্থনীতির ভিত্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই তৈরি পোশাকসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানা যাতে লোডশেডিং থেকে বেরিয়ে আসতে পারে সে বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post