শাহারুল ইসলাম, বেনাপোল (যশোর): দেশব্যাপী চলমান জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর-কেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। তেলের সরবরাহ ঘাটতি, অস্বাভাবিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং যানবাহন সংকটের কারণে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে চরম ধীরগতি। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই স্থলবন্দর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় টনপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এতে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে পণ্য আমদানির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখছেন, আবার কেউ কেউ কম পরিমাণে পণ্য আমদানি করছেন।
জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দর এলাকায় ট্রাক ও লরির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় শত শত পণ্যবাহী ট্রাক খালাসের অপেক্ষায় দিনের পর দিন আটকে রয়েছে। এতে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং আমদানিকৃত পণ্য নির্ধারিত সময়ে গুদামে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পচনশীল পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত শনিবার বেনাপোল বন্দরে মাত্র ১০৩টি ট্রাকে পণ্য লোড হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। এর আগে বৃহস্পতিবার ৮৮১টি, বুধবার ৭৭৭টি, সোমবার ৯৬৮ ও রোববার ৯৬১টি করে ট্রাকে পণ্য আমদানি হয়েছিল। মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ ছিল এবং শুক্রবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। এই তুলনামূলক চিত্র থেকেই স্পষ্ট, জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দরের কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
আমদানিকারক ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, আমরা সময়মতো পণ্য খালাস করতে পারছি না। পরিবহন সংকটের কারণে অনেক পণ্য গুদামে পড়ে থাকছে। এতে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে এবং লোকসানের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
ট্রাকচালক ও পরিবহন মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি সংগ্রহ করতে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তারা জানান, বাড়তি খরচ সামাল দিতে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে যশোর জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি বদিউজ্জামান বাবলু বলেন, এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন পরিচালনায় ব্যয় বেড়েছে, ফলে বাস্তবতার নিরিখেই যানবাহন চলাচল করছে।
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে সাময়িকভাবে পণ্য পরিবহন ও খালাস কার্যক্রমে ধীরগতি এসেছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। খুব দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।
অন্যদিকে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন, ট্রাক চলাচল কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণেও প্রভাব পড়ছে। যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post