নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সয়াবিন তেল, চিনি, মসুর ডালসহ বিভিন্ন মুদি পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক দফায়। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঝড়-বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজার পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই বাড়তি। সাধারণ মানুষ বলছেন, সীমিত আয়ে সংসার চালানো এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বাজারে গিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন দামের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা, সেগুনবাগিচা, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে ডিম, চাল, সবজি ও মাছের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্রেতাই বাজারে এসে প্রয়োজনীয় জিনিস কম কিনে ফিরে যাচ্ছেন।
খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের ক্রেতা আমিনুর রহমান বলেন, বাজারে এলে মনে হয় পকেট ডাকাতি হচ্ছে। সবজির চড়া দাম শুনে যখন ডিম কিনতে গেলাম, দেখি সেখানেও আগুন। গত সপ্তাহে যে ডিম ১৩০ টাকা ডজন কিনলাম, আজ তা ১৫০ টাকা চাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এখন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। চড়া দামের কারণে ভালো মাছ-মাংস, এমনকি সোনালি মুরগিও বাজারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এখন ব্রয়লার, পাঙাশ বা ডিমভর্তাও খেয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে দেশের বিভিন্ন কৃষি অঞ্চল থেকে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। এতে পাইকারি বাজার থেকেই বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের বিক্রেতা আব্দুর রহিম বলেন, বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দামও বাড়তি। সবজির দাম বেশি হওয়ায় মানুষ এখন ডিম বেশি কিনছে। গত দুদিনে লাফিয়ে লাফিয়ে ডিমের দাম বেড়ে এখন ১৫০ টাকায় ঠেকেছে। তবে সে তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম ঠিক আছে।
বাজারে বর্তমানে আলু ও পেঁপে ছাড়া প্রায় সব ধরনের সবজি কেজিপ্রতি ৮০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও কাঁচামরিচ, করলা, শিম ও বেগুনের দাম আরও বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কম থাকায় আগামী কয়েক দিন দাম আরও বাড়তে পারে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত সবজির দাম বাড়লে নিম্নআয়ের মানুষ তুলনামূলকভাবে কম দামের প্রোটিন উৎস হিসেবে ডিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এবারও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাড়তি চাহিদার কারণে ডিমের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর বাজারগুলোয় বর্তমানে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা। আর গত রোজার সময় একই ডিম বিক্রি হয়েছিল ১১০ টাকার আশেপাশে।
এদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি মুরগির দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও সোনালি মুরগির দাম ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকায় পৌঁছেছে।
চালের বাজারেও স্বস্তি নেই। সারা দেশে বোরো ধান কাটা শুরু হলেও খুচরা বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বরং মাঝারি ও মোটা চালের দাম আরও কিছুটা বেড়েছে। বাজারে মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম বেড়েছে প্রায় চার শতাংশ এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি।
ভোজ্যতেলের বাজারেও নতুন ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করলেও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মুনাফার অংশ কমিয়ে দিয়েছে। এতে ছোট দোকানিরা তেল বিক্রিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বিক্রেতাদের অভিযোগ, লিটারপ্রতি মাত্র দুই টাকা লাভে তেল বিক্রি করে দোকান পরিচালনা করা কঠিন। ফলে অনেক দোকানে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে গেছে। কোথাও কোথাও ক্রেতাদের ঘুরেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে অন্যান্য মুদি পণ্যের বাজারেও। চিনি, মসুর ডাল, প্যাকেটজাত গুঁড়া মসলা, পোলাওয়ের চালসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম গত দুই থেকে তিন সপ্তাহে কয়েক দফায় বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের পণ্যের দামেই চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে মাছ ও মাংসের বাজারও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত রমজানের পর থেকেই গরুর মাংসের দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে ঢাকার বাজারে গরুর মাংস মানভেদে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর খাসির মাংস কিনতে ক্রেতাদের গুণতে হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি।
মাছের বাজারেও একই অবস্থা। চাষের মাছ থেকে শুরু করে নদ-নদীর মাছÑসব ধরনের মাছের দামই বেড়েছে। এক কেজি ওজনের রুই বা কাতলা মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো তুলনামূলকভাবে কম দামের মাছও এখন ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে মাছ কিনতে আসা গৃহিণী রেহানা পারভীন বলেন, এখন বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে শুধু ঘুরতে হয়, ব্যাগে ভরার মতো সাশ্রয়ী কিছু আর নেই। বাজারে মাছ-মাংসের দাম এত বাড়ছে যে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, আয় বাড়ছে না, কিন্তু প্রতিদিনই বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে সংসারের খরচ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকা থেকে মাছ, মাংস কিংবা ভালো মানের খাবার কমিয়ে দিচ্ছেন। বাজার পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post