কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা আজ যে অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি গ্রামীণ জনপদ। কৃষক, খামারি, নারী উদ্যোক্তা, যুব উদ্যোগ, ক্ষুদ্র স্টার্টআপ এবং সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন স্তরের অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অর্থনীতি এগিয়ে চলছে কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলোÑএই প্রান্তিক বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন এবং তাঁদের পুঁজির সুরক্ষা সবচেয়ে অনিশ্চিত; ফলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এখনই এই প্রশ্নটিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো মধ্যস্বত্বভোগী ও ফোড়িয়াদের আধিপত্য; কৃষক বা খামারি উৎপাদন করেন কিন্তু ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে ভোক্তা উচ্চমূল্য পরিশোধ করেন। যুগ যুগ ধরে চলা এমন অস্বচ্ছ বাজার কাঠামো শুধু উৎপাদককে ক্ষতিগ্রস্ত করে না বরং বিনিয়োগের আগ্রহও কমিয়ে দেয়। সরাসরি বাজার সংযোগ, ডিজিটাল বিপণন প্ল্যাটফর্ম এবং সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থার প্রসার এই সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে।
কৃষি পণ্যের পোস্ট-হারভেস্ট লস বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নীরব সংকট; পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন, পচনশীল কৃষিপণ্যের জন্য মাল্টি-স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি, ধান গম ভুট্টা, তৈলবীজ জাতীয় ফসলের জন্যÑআধুনিক ড্রায়িং প্রযুক্তি, সাইলো এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। গ্রামীণ পর্যায়ে কোল্ড স্টোরেজ, ড্রায়িং সিস্টেম এবং ডিহাইড্রেটেড খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলা গেলে এই ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব, এতে বিনিয়োগ সুরক্ষিত হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তাও শক্তিশালী হবে।
প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা; উন্নত বীজ, সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, লাইভস্টক ব্যবস্থাপনায় উন্নত ফিড, ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা সুবিধাÑএসব বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় উৎপাদনশীলতা কম থাকে, তাই গ্রামীণ পর্যায়ে সার্ভিস প্রোভাইডার ও এক্সটেনশন সিস্টেমকে আরও কার্যকর করতে হবে এবং এ খাতে এগ্রি স্টার্টআপ গড়ে ওঠার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। দেশের টেকসই অগ্রগতির জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বিনিয়োগ সুরক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; মানসম্মত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করলে বাজারে স্থিতিশীলতা আসে এবং ভোক্তার আস্থা বৃদ্ধি পায়। এজন্য মান নিয়ন্ত্রণ, ট্রেসেবিলিটি এবং নিরাপদ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তি; মাইক্রোগ্রিডভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানিÑযেমন সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস ও জৈব জ্বালানিÑগ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন খরচ কমায় এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে।
গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি ও ওয়েটল্যান্ড ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই উন্নয়ন মডেল হতে পারে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে সমন্বিত করে একটি সার্কুলার বা চক্রাকার উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুললে বর্জ্য কমবে, উৎপাদন বাড়বে এবং পরিবেশ সংরক্ষণ সম্ভব হবে।
তবে এসব উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রয়োজন কার্যকর নীতি ও সমন্বিত বাস্তবায়ন; বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব উন্নয়ন কার্যক্রমকে দুর্বল করে দেয়, তাই একটি সমন্বিত নীতি কাঠামোর মাধ্যমে কৃষি, খাদ্য, প্রাণিসম্পদ, জ্বালানি ও স্থানীয় সরকার খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি ডাইরেক্ট ফরেন ইনভেস্টমেন্ট আকৃষ্ট করার জন্যও একটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি জরুরি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বীমা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে পারেন।
বাংলাদেশে শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনকে দক্ষ, স্বচ্ছ ও সমন্বিত করতে হবে, তাহলেই প্রান্তিক বিনিয়োগকারীদের পুঁজির সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে এই বাস্তবতার ওপরÑগ্রামকে শক্তিশালী না করলে জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না। অন্যদিকে গ্রামকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে প্রান্তিক বিনিয়োগকারীর (কৃষক, খামারি, গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা) পুঁজির নিরাপত্তা। এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি স্পেশালিস্ট
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post