রায়হান আহমেদ তপাদার: অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও চলমান বৈশ্বিক সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী অর্থবছরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে অর্থবিভাগ বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করেছে ৯ লাখ ২০ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেটের রেকর্ড হতে যাচ্ছে। আমরা যখন উন্নয়ন বা বাজেটের কথা বলি, তখন আর্থিক খাতের গুরুত্ব আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়। কারণ আধুনিক অর্থনীতিতে আর্থিক খাতই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কৃষি, শিল্প বা সেবা-যে খাতের উন্নয়নই করতে চান না কেন, আর্থিক খাতকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। বিনিয়োগের জন্য ঋণ প্রয়োজন, সঞ্চয়ের নিরাপদ ব্যবস্থা প্রয়োজন, অর্থের প্রবাহ প্রয়োজনÑএসবই আর্থিক খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কাজেই একটি দক্ষ, শক্তিশালী ও কার্যকর আর্থিক খাত ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের দেশের আর্থিক খাতের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে ব্যাংক খাত। কারণ পুঁজিবাজার বা বন্ড মার্কেট এখনো খুব দুর্বল। ফলে অর্থায়নের প্রধান দায়িত্ব ব্যাংকগুলোকেই বহন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিগত সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংক খাত অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক ব্যাংক কার্যত ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে। বর্তমান সময়েও সেই পরিস্থিতির খুব একটা মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। ব্যাংক খাতের মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। যেমন পরিচালনগত দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সমস্যাকে আড়াল করার প্রবণতা। খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছে বলে যে তথ্য দেওয়া হয়, সেটার বড় অংশই এসেছে শর্ত শিথিলের মাধ্যমে, প্রকৃত আদায়ের মাধ্যমে নয়। ফলে এটাকে বাস্তব উন্নতি বলা কঠিন।
যদি সত্যিকার অর্থে ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হয়, তাহলে এসব মৌলিক সমস্যার সমাধানে যেতে হবে। কারণ ব্যাংক খাতকে সুস্থ না করে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানÑকোনো ক্ষেত্রেই কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের উন্নয়নের একটি ধারা ছিল, যা নব্বইয়ের দশক থেকে কিছুটা হলেও দ্রুত গতিসম্পন্ন হয়েছে। আশির দশকের তুলনায় নব্বই দশকে আমরা মোটামুটি একটা প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়েছি এবং সেই সঙ্গে আমাদের দারিদ্র্য কমেছে। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক উন্নয়নেও বেশকিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। আবার আমরা যদি পরে সময়টা ভাগ করে দেখি, তাহলে দেখব যে ২০১৫-১৬ সালের পর থেকে আমাদের উন্নয়নের গতি কাগজে-কলমে কমেনি, কিন্তু বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি দেখেছি। অর্থ পাচার, অর্থ আত্মসাৎ থেকে আরম্ভ করে সামগ্রিকভাবে দেশে একটা দুর্বৃত্তায়নের অর্থনীতির ধারা লক্ষ্য করেছি। সেই ধারার পরিণতি হলো চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন। এ সরকার দেশের শাসনভার নেওয়ার পর রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি খাতের সংস্কার চেয়েছিল। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কমিশন করা হয়েছিল এবং সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল অর্থনীতির সংস্কার। কেননা এ সরকার একটা সমস্যাসংকুল অর্থনীতি পেয়েছিল। আর এক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলো দূর করা এবং অর্থনীতিকে তার স্বাভাবিক গতিপথে ফিরিয়ে আনা। সেসময় মূল্যস্ফীতি, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত, নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃজন না হওয়াসহ অর্থনীতিতে নানা সমস্যা ছিল। এসব সমস্যা সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকার খুব একটা সফল হয়েছে বলা যায় না।
বর্তমান সরকার যখন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলো তখন কিন্তু অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিতে গুণগত তেমন পরিবর্তন হয়নি এবং যে সমস্যাগুলো আগে থেকে বিদ্যমান ছিল, সে সমস্যাগুলোই তারা পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো আরও গভীরতর হয়েছে। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সমাজে এমন কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজেদের স্বার্থে বাজারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে। তারা ব্যবসায়ী হোক বা অন্য কোনো গোষ্ঠী তাদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ও স্বার্থের সম্পর্ক থাকে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। সেই অঙ্গীকারের অভাব আমরা দেখেছি। বিগত সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা দেখেছি, বাজার তদারকির ক্ষেত্রে মূলত খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপরই চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারে গিয়ে মূল্যতালিকা আছে কিনা বা খুচরা বিক্রেতা বেশি দাম নিচ্ছে কিনা-এসব বিষয় দেখেছে। কিন্তু যারা প্রকৃত অর্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ বড় আড়তদার বা শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায়নি। অথচ তারাই বাজারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। ফলে সমস্যার মূল জায়গায় হাত না দিয়ে শুধু খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই বিষয় দেখা গেছে।বর্তমান সরকারের সময় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে এবং এর পেছনে কিছু বহিরাগত কারণও কাজ করছে, যেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিভিন্ন নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর।
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। কাজেই মূল্যস্ফীতির ওপর এ বৈশ্বিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। যদি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী মাসগুলোয়ও দেশে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে যদি আমরা বাজেটের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাচ্ছে বর্তমান সরকার একটি বড় আকারের বাজেট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ এটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে চাইবে। আমরা যেটুকু জানতে পারছি, তাতে বাজেটের আকার সম্ভবত ৯ লাখ কোটি টাকার আশপাশে হতে পারে। তবে একটা বিষয় হচ্ছে, শুধু টাকার অংক দিয়ে বাজেটের বড়ত্ব বিচার করলে হবে না। যদি জিডিপির অনুপাতে দেখি তাহলে বাজেটের আকার হয়তো ১৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। অথচ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাজেটের আকার আরও বড় হওয়া দরকার। এটা ২০-২২ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল। কারণ বর্তমানে আমরা উন্নয়নের যে পর্যায়ে আছি, সেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাসহ প্রায় সব খাতেই অর্থের ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এখনো জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দও আমরা দিতে পারছি না। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ২ শতাংশের নিচে, যেখানে এটি অন্তত ৪-৫ শতাংশ হওয়া উচিত। কাজেই আমরা যদি সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে বড় বাজেটের প্রয়োজন রয়েছে। তাই শুধু বাজেটের আকার বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে বাজেটের গুণগত মান বৃদ্ধির দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
গবেষক ও কলামিস্ট
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post