মো. ইসমাইল হোসাইন: সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারে নতুন শক্তির উত্থান হতে থাকে। নতুন শক্তির উত্থানে এবং ক্ষমতার বিস্তারে একটি দেশের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, কূটনৈতিক ও অথনৈতিক তৎপরতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং কৌশলগত সম্পর্ক দেখা যায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে। একুশ শতকে বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার লড়াইয়ে চীনের তীব্র আকাক্সক্ষা লক্ষণীয়। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর মাও সে তুং বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়ান আন মেন স্কয়ারে দাঁড়িয়ে সমাজতান্ত্রিক চীনা রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করে আসছে। গত শতকের আশির দশকের শুরুর দিকে দেং জিয়াও পিং চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে এলেন। এর বাস্তবিক অর্থ পুঁজিবাদী অর্থনীতির ওপর কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। তিনি অর্থনীতির ব্যাপক সংস্কার করেন। এর ফলে চীন ক্রমাগত অর্থনৈতিক শক্তি হতে থাকে। বর্তমানে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি। চীনের জিডিপি ১৯ দশমিক ৫৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই চীন বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আর শক্তিশালী ভূমিকা নিচ্ছে। তার লক্ষ্য ২০৪৯ সালের মধ্যে চীনকে বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনের সুপারপাওয়ার হতে আরো কয়েক দশক সময় লাগতে পারে, অথবা একুশ শতকের পুরো সময় ব্যয় করতে হবে। বেইজিংয়ের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্র শুরুর দিকে নিজেদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, এরপর প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের দেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে। চীনও ঠিক একই নীতি গ্রহণ করেছে। চীন নিজের সিমান্তের সুরক্ষা আগে নিশ্চিত করেছে। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চীনের সীমান্ত বেশ সুরক্ষিত। বেইজিং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর উপস্থিতি বেইজিংয়ের প্রধান সমস্যা। চীনের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন দিয়ে চলাচল করে। ভিয়েতনামের সঙ্গে তিক্ততা কাটিয়ে বর্তমানে বেশ ভাল সম্পর্ক তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর মালাক্কা প্রণালির দেশ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ ও দুই মাইল চওড়া মালাক্কা প্রণালি ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরকে সংযুক্ত করেছে। চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালি চোক পয়েন্ট। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অথবা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালি হবে প্রধান উদ্বেগের বিষয়। মালাক্কা দিয়ে প্রতি বছর ৯৪ হাজারেরও বেশি পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ যাতায়াত করে, যা বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ বাণিজ্যপণ্য। চীনের আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই পথ দিয়ে। তাই চীনের জন্য বিকল্প পথের প্রয়োজন। মালাক্কা প্রণালির নির্ভরতা কমাতে চীন মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বঙ্গোপসাগর উপকূলে কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। এখান থেকে তেল ও গ্যাস পাইপলাইনে সরাসরি চীনের ইউনান প্রদেশে যাবে। পাকিস্তানের গোয়াদারে সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করছে, এর মাধ্যমে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত হবে।
বর্তমানে চীন বিশ্ববাণিজ্য, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও সমুদ্র আধিপত্য বিস্তার, নতুন প্রযুক্তি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে মরিয়া। তবে চীনের রাজনৈতিক মতাদর্শ অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা চর্চা করা তেমন দৃশ্যমান নয়।
চীনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা বিশ্ব থেকে আলাদা। পশ্চিমা সমাজচেতনার মূলে রয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা আর চীনা সমাজচেতনায় সমষ্টি বা ঐক্যকে বিশেষ স্থান দেওয়া হয়। তাদের কাছে গণতান্ত্রিক আদর্শের চেয়ে ঐক্য এবং অর্থনৈতিক উন্নতি বেশি জরুরি।
ভূরাজনৈতিক লেখক রবার্ট ক্যাপলান বলেছিলেন, ‘বিশ শতকের শুরুতে ক্যারিবিয়ান সাগর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, একুশ শতকে চীনের কাছে দক্ষিণ চীন সাগর তেমনি গুরুত্বপূর্ণ’। দক্ষিণ চীন সাগরের চলাচল পথগুলো সুরক্ষিত রাখা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেল, গ্যাস, মূল্যবান ধাতু ও খনিজ সম্পদ এই পথে চীনে প্রবেশ করে। তাদের পথকে সুরক্ষিত করতে এবং এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করার জন্য দক্ষিণ চীন সাগর ও নিজস্ব উপকূলে কূত্রিম দ্বীপ নির্মাণ করছে বেইজিং। সমুদ্রবন্দর ও যুদ্ধবিমান ওঠা-নামার জন্য রানওয়ে তৈরি করছে। এতে আকাশ নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশ বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ চীন সাগর এবং তলদেশের সমস্ত জ্বালানি সম্পদের মালিকানা চীন নিজেদের দাবি করে। তাতে আশেপাশের দেশগুলো বেশ উদ্বিগ্ন এবং মাঝেমধ্যে তাদের মধ্যে কড়া বাক্যের তথ্য আদান-প্রদান চলে। চীন প্রকৃত অর্থে কখনোই নৌ পরাশক্তি ছিল না। তবে চীন এখন ব্লু ওয়াটার নেভি গড়ে তুলেছে। এর ফলে চীন গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করতে পারবে। তাদের কাছে বর্তমানে তিনটি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে। প্রথম রণতরী সোভিয়েত আমলের যা ইউক্রেন থেকে ক্রয় করে নিজেদের মতো আধুনিকায়ন করেছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের নৌবাহিনীতে মোট ৯টি বিমানবাহিনী রণতরী যুক্ত হবে। শক্র জাহাজে আঘাত হানতে সক্ষম মিসাইল সিস্টেম বাড়িয়েই চলছে বেইজিং। চীন যতই তাদের যুদ্ধজাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে বাড়াবে, যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা ততই কমে আসবে। ধারণা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্র শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চীনের আরও দু’দশকের বেশি সময় লাগতে পারে।
চীনের সঙ্গে জাপানের বসতিহীন সেনকাকু দীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধ রয়েছে। বিরোধের আরেকটি কারণ হচ্ছে পূর্ব চীন সাগরে গ্যাসের মজুত। প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশের ক্ষেত্রে চীনের সবচেয়ে বড় বাধা জাপান এবং জাপানের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। আবার চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ২৩তম প্রদেশ হিসেবে দাবি করে। ১৯৭৯ সালের তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট অনুযায়ী, চীন যদি তাইওয়ানে আক্রমণ চালায়, তাহলে তাইওয়ানকে সুরক্ষা দিবে যুক্তরাষ্ট্র। তাইওয়ানকে উন্নতমানের অস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহিনী দিয়ে বেশ শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে চীন সরাসরি আক্রমণ না করে, তাইওয়ানে সফট পাওয়া ব্যবহার করছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (ইজও) পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে চীন সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে যুক্ত করবে। চীনের এমন উদ্যোগে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ ঘনিষ্ঠ করেছে। এর মাধ্যমে চীন বিশ্বব্যাপী তাদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চায়। শি জিনপিং এর এমন পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকগুলো দেশ সন্দেহের চোখে দেখে। চীনের প্রভাব কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বৃদ্ধির জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের সমুদ্র সীমানার ৬৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির দুই-তৃতীয়াংশ ও বৈশ্বিক জিডিপির ৬০ শতাংশ রয়েছে এ অঞ্চলে। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে বেইজিংয়ের প্রভাব কমানোর জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো কোয়াড জোট।
একুশ শতকে এ অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে বড় বড় সমঝোতা অপেক্ষা করছে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে দায়িত্বশীল বিশ্বশক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল পররাষ্ট্রনীতি চীনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কিছুটা আস্থা হারিয়েছে। ইরান যুদ্ধে জ্বালানি শক্তি সংকটে এশিয়ার দেশগুলো চীনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকবে। আধুনিক প্রযুক্তি, শিল্প ও প্রতিরক্ষা খাতে বিরল খনিজ অপরিহার্য। আর চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ মজুতের অধিকারী দেশ। ইউএসজিএস তথ্য বলছে চীনে ৪ কোটি ৪০ লাখ টন বিরল খনিজ মজুত আছে। দ্বিতীয় ব্রাজিল আর যুক্তরাষ্ট্রের ১৯ লাখ টন বিরল খনিজের মজুত আছে। তাই বিরল খনিজের ওপর চীনের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে।
বর্তমানে আমরা বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে এগোচ্ছি, যা ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় জুড়েই ছিল, যেখানে একাধিক শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলবে। আবার ছোট শক্তিগুলোও চ্যালেঞ্জ জানাবে বড় শক্তিকে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির প্রধান খেলোয়াড়। আর রাশিয়া এখন জুনিয়র খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। একুশ শতকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলই হবে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। চীন এখন নিজেদের সুপারপাওয়ারে পরিণত করার জন্য এশিয়ার বাহিরে ইউরোপ, আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলছে। তবে চীনের সামনে রয়েছে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ। আর তা মোকাবিলায় হবে চীনের ভবিষ্যৎ।
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা কলেজ
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post