আমাদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ঘটনা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বীজ বুননের অন্যতম দাবি ছিল আমাদের অধিকার, বৈষম্যমুক্ত সমাজ। আমাদের স্বপ্ন ছিল একদিন বাঙালি জাতি ভালো মানুষের, সমৃদ্ধ অর্থনীতির শ্রষ্ঠ জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে পরিচিতি লাভকরবে। স্বাধীনতা অর্জন হলেও বৈষম্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপান্তরের অনেকাংশে পিছিয়ে পড়েছি আমরা। ২০২৪-এ বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়তে তরুণ প্রজন্ম আবার এগিয়ে আসে। আশার বিষয় দেশের মানুষ আজ নতুন করে স্বপ্ন দেখছে, এবার হবে সত্যিকারের বৈষম্যমুক্ত সমাজ তথা অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। যা খুব শিগগিরই বিশ্ব মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
এখন দেশে জনশক্তির বোনাসকাল অতিক্রম করছে। অর্থাৎ দেশে জনসংখ্যায় খ্যায় যুবশক্তি বেশি। এই তরুণদের হাত ধরেই উন্নয়ন অগ্রগতির মহাসড়কে পৌছাবে বাংলাদেশ। কিন্তু এখানে বলে রাখা প্রয়োজন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে দেশে যদি সৎ, মানবিক ও ইতিবাচক উদার দৃষ্টিসম্ভন্ন ভালো মানুষ না হয় তাহলে সত্যিকারের ভালো দেশ হয়ে ওঠা যাবে না। শারীরিক সুস্থতা, মানসিক সুস্থতা, আত্মিক সুস্থতা, সামাজিক সুস্থতা না থাকলে ভালো মানুষ হওয়া যায় না।
তাই এখন জাতীয় স্লোগান হওয়া প্রয়োজন ‘ভালো মানুষ ভালো দেশ বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ’। ভালো মানুষ তৈরির জন্য এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে যুবসমাজকে দিয়ে। তাদের সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত টোটাল ফিটনেস বা সম্পূর্ণ সুস্থতা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় প্রচার মাধ্যমেও সম্পূর্ণ সুস্থতা নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে। রাষ্ট্রের মন্ত্রী, সচিব, শিক্ষাবিদসহ সব শীর্ষ ব্যক্তিদের অন্যতম বক্তব্য হতে পারে তরুণ সমাজের টোটাল ফিটনেস।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের জীবনেও পড়ছে। এ সময়ে আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে দ্রুত বদলে যাওয়ার উত্তাপ লেগেছে। প্রযুক্তির প্রসার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে অনেক মন্দ বা ক্ষতিকর কিছুতে সহজে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। জীবনযাত্রার মান বাড়ার ফলে আমরা নিজেদের অনেক ঐতিহ্য ঐতিহ্য আভিজাত্যও হারিয়ে ফেলছি। পারিবারিক শিক্ষা-দীক্ষায় শুদ্ধাচার, শিষ্টাচার নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে ফেলছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নীতি-নৈতিকতা ও সৎ মানুষ বানানোর পরিবর্তে শুধু সনদ অর্জনই অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভালো মানুষের সংজ্ঞা নিয়ে এখানে কয়েকটি লাইন তুলে ধরছি- ‘নীতি-নৈতিকতাবান শুদ্ধাচারী মানুষই ভালো মানুষ। যা কিছু ভালো, যা কিছু কল্যাণকর তাই শুদ্ধ। যা কিছু মন্দ, যা কিছু অকল্যাণকর তাই অশুদ্ধ। যা কিছু সত্য, সুন্দর ও শুভ তাই শুদ্ধ। যা কিছু ন্যায় ও মানবিক তাই শুদ্ধ। যা কিছু অন্যায়, জুলুম ও অমানবিক তাই অশুদ্ধ। যা শুদ্ধ ও কল্যাণকর তাই ধর্ম আর অশুদ্ধ ও অকল্যাণকর তাই অধর্ম।
গত পাঁচদশকে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে- এটা আমাদের জন্যে আনন্দায়ক। কিন্তু একই সঙ্গে সঙ্গে ভাববা ভাববার বিষয়, আমরা পিছিয়ে পড়েছি আচার-আচরণ ও নৈতিকতা, মনুষ্যত্ব ও মানবিকতায়। যার নিদর্শন সমাজের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে, যা পত্রিকার পাতা উল্টালেই পাওয়া যায়।
দুর্বলকে শোষণ করে শক্তিমান যারা, তারা যদি শুদ্ধাচারী হয় তাহলে শোষণের বদলে দুর্বলকে তারা নিরাপত্তা দেবে। কারণ শুদ্ধাচারী মানুষ জালিম হন না, হন রক্ষক। নিজের মতকে তারা যেমন সম্মান করেন, তেমনি সম্মান করেন আরেক জনের মতামতকে। ফলে মতের অমিল হওয়ার প্রতিক্রিয়া তারা শক্তি প্রয়োগ করে নয়, সহমর্মিতার সঙ্গে করেন। স্রেফ এই একটি গুণই পারে বর্তমান সময়ের জুলুম-নিপীড়ন অনেকাংশেই কমাতে।
একজন ভালো মানুষ নিজের স্বার্থটাকে আগে রাখেন না, অন্যের স্বার্থে ভাগ বসানো তো দূর অন্যের হক নষ্ট করে নিজে আঙুল ফুলে কলাগা কলাগাছ হবেন না এটাই স্বাভাবিক। এই এই একটি গুণ থাকলে বহুলাংশেই কমবে দুর্নীতি, ভেজাল, দখলদারিত্ব, সিন্ডিকেটবাজি। পরিণামে দেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে।
আসলে সোনার দেশ গড়তে লাগে সোনার মানুষ তথা ভালো মানুষ। আর সোনার মানুষ গড়তেই এখন নীতি-নৈতিকতা শুদ্ধাচারের চর্চা খুব প্রয়োজন।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post