এবিএম তৌফিক-উল ইসলাম: বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবসম্পদের মানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যেসব দেশ উন্নত ও শক্তিশালী হয়েছে, তারা উন্নত ও কার্যকর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সাফল্য অর্জন করেছে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য আধুনিক, ব্যবহারিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে, নারীদের শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সাক্ষরতার হার বেড়েছে। এ ছাড়াও সরকার উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং ডিজিটাল শিক্ষা উদ্যোগের মতো নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তবে এসব সাফল্যের পরও শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো বেশ কিছু গুরুতর সমস্যা বিদ্যমান।
অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রকৃত শিক্ষার চেয়ে পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে বিষয় বোঝার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই মুখস্থনির্ভর পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে সীমাবদ্ধ করে। তাছাড়া অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ, কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরতা, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষাগত বৈষম্য এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মতো সমস্যাও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এখনো প্রভাবিত করছে।
এক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর সফল শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে। এসব দেশ শুধু শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করেনি, বরং তাদের সৃজনশীল, দক্ষ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবেও গড়ে তুলেছে।
ফিনল্যান্ডকে প্রায়ই বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাব্যবস্থার দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আনন্দময় ও চাপমুক্ত পরিবেশে শিক্ষা প্রদান। সেখানে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং ছোট শিশুদের ওপর অতিরিক্ত শিক্ষার চাপ সৃষ্টি করা হয় না। সৃজনশীলতা, ব্যবহারিক জ্ঞান এবং সমালোচনামূলক চিন্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং পরীক্ষার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতা একটি অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা। শিক্ষকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয় এবং তারা নিজেদের পদ্ধতিতে পাঠদান করার স্বাধীনতা পান। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ না করে বিষয়গুলো গভীরভাবে বুঝতে শেখে।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার বেশ কিছু দিক বাংলাদেশে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা হলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পেতে পারে। অতিরিক্ত শিক্ষার চাপের কারণে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মানসিক চাপ ও উদ্বেগে ভোগে। যদি একটি চাপমুক্ত ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা আরও আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারবে। এ ছাড়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মান উন্নত করা হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব।
অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর তার দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও সঠিক শিক্ষাপরিকল্পনার মাধ্যমে সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। সেখানে গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং গণিত শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীলতার চর্চা শেখানো হয়। আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার ব্যবহার সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থাকে অত্যন্ত সফল করেছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত শিক্ষার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে পরিচালনা করবে। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অপরিহার্য হবে। তাই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তি ও গবেষণার সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। একইসঙ্গে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষারও সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
বাস্তব দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করেও চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়। যদি সিঙ্গাপুরের মতো চাকরিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রের জন্য আরও প্রস্তুত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।
এ ছাড়াও জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য পরিচিত। জাপানে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীলতা, দলগত কাজ, সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয়। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সামাজিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করে।
বাংলাদেশে মানবিক ও নৈতিক শিক্ষাকে প্রায়ই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী একাডেমিকভাবে সফল হলেও মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক চেতনার অভাব দেখা যায়। অথচ একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু মেধাবী নয়, সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিকও প্রয়োজন। তাই জাপানের মতো নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও ভালো শিক্ষার্থী হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে পারবে।
বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে কোনো একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি অনুসরণ করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা এবং অগ্রাধিকার রয়েছে। তাই বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত শিক্ষামডেলই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ডের সৃজনশীল ও চাপমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা, সিঙ্গাপুরের প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং জাপানের শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ একটি আধুনিক ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
একইসঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস এবং সামাজিক মূল্যবোধও সংরক্ষণ করতে হবে। কেবল বিদেশি মডেল অনুকরণ করলেই সাফল্য আসবে না; বরং দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে উৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, বরং বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে, প্রশ্ন করতে এবং বিশ্লেষণ করতে শেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মান উন্নত করতে হবে। একজন দক্ষ শিক্ষক পুরো জাতির ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে পারেন। তাই শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্র ও বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে হবে। পঞ্চমত, অতিরিক্ত শিক্ষার চাপ কমিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষার চাপে অনেক শিক্ষার্থী উদ্বেগ ও হতাশায় ভোগে, যা তাদের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সবশেষে, শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষাকে আরও জোরদার করতে হবে। একটি শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো জাতির জন্যই মঙ্গলজনক। তাই বাংলাদেশকে উন্নত দেশগুলোর সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি আধুনিক, সৃজনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সফল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। তখন শিক্ষার্থীরা শুধু একাডেমিকভাবে সফলই হবে না, বরং বিশ্বমানের দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন নয়; বরং জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিক ও সচেতন মানুষ তৈরি করা। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় কার্যকর ও আধুনিক পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।
রিসার্চ এসোসিয়েট, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post