শিক্ষা ডেস্ক: সকাল আটটা। কুড়িগ্রামের একটি মফস্বল স্কুলের করিডর দিয়ে হাঁটছেন প্রধান শিক্ষক মফিজুল ইসলাম। তার হাতে একগুচ্ছ আবেদনপত্র। কিন্তু তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। স্কুলের নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে এবার রেকর্ড-সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। স্কুলের একমাত্র গণিত শিক্ষক গত মাসে অবসরে গেছেন, আর পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষককে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছে জেলা সদরে।
মফিজুল ইসলাম বিড়বিড় করে বললেন, ‘ডিজিটাল ল্যাব আছে, ল্যাপটপ আছে, কিন্তু যে মানুষটা এই শিশুদের সমীকরণের আনন্দ শেখাবে, সেই মানুষটাই তো নেই। আমরা কি তবে শুধু দালানকোঠা আর যন্ত্র দিয়েই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ব?’
মফিজুল ইসলামের এই আক্ষেপ আজ বাংলাদেশের হাজারো বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যখন বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ঘরে তুলছে, তখন বাংলাদেশের স্টেম (ঝপরবহপব, ঞবপযহড়ষড়মু, ঊহমরহববৎরহম, ধহফ গধঃযবসধঃরপং) শিক্ষার ভিত্তি তথা বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষক সংকট এক জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।
কেন স্টেম শিক্ষা এখন বিলাসিতা নয়, অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা?
বলা হয়ে থাকে, আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্বের ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থানের জন্য কোনো না কোনোভাবে বিজ্ঞান বা গণিতের দক্ষতা প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্টেম শিক্ষার গুরুত্ব কেবল প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা নয়, বরং একটি যৌক্তিক ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।
১. বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা: দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দক্ষ শিক্ষকের অভাব প্রকট। ইউনেস্কোর সা¤‹্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে আমাদের মাত্র ৫৫ শতাংশ শিক্ষকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে। এই শূন্যতা পূরণ না হলে আমাদের তরুণ প্রজš§ বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কেবল ‘অদক্ষ শ্রমিক’ হিসেবেই থেকে যাবে।
২. স্মার্ট অর্থনীতির মেরুদণ্ড: সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), রোবোটিক্স এবং ডেটা সায়েন্সের মতো বিষয়গুলো এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। এই ভিত্তি তৈরি করতে হলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই গণিত ও বিজ্ঞানের ভয় দূর করতে হবে, যা কেবল একজন দক্ষ শিক্ষকই করতে পারেন।
সংকট যেখানে গভীর: কেন মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছেন না?
বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষক সংকটের পেছনে কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ রয়েছে যা নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন:
আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদার অভাব: বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত-পদার্থবিজ্ঞানের একজন মেধাবী ছাত্র যখন দেখেন করপোরেট সেক্টর বা ব্যাংকিং খাতে বেতন ও মর্যাদা শিক্ষকতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি, তখন তিনি শিক্ষকতাকে ‘শেষ বিকল্প’ হিসেবে বেছে নেন।
মফস্বলে আবাসন ও সুযোগ-সুবিধার অভাব: গ্রাম বা উপজেলা পর্যায়ে নিয়োগ পেলেও অনেক সময় মেধাবী শিক্ষকরা সেখানে থাকতে চান না উন্নত জীবনযাত্রার অভাবে।
শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা: এনটিআরসিএ বা পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেক সময় এত দীর্ঘ হয় যে, প্রার্থী অন্য চাকরিতে চলে যান।
নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রস্তাবিত রোডম্যাপ: শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই ৫ শতাংশ জিডিপি বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে কেবল বাজেট বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থের সঠিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে-
১. ‘স্টেম টিচার্স ইনসেন্টিভ প্যাকেজ’
প্রবর্তন বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক ভাতা বা ‘স্কেশাল ক্যাডার’ সুবিধা প্রবর্তন করা যেতে পারে। যারা দুর্গম বা গ্রামীণ এলাকায় পড়াবেন, তাদের জন্য আবাসন ও অতিরিক্ত বোনাসের ব্যবস্থা করলে মেধাবীরা উৎসাহিত হবেন।
২. ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ডিজিটাল টুলস
শিক্ষককে কেবল চক-ডাস্টারে সীমাবদ্ধ না রেখে আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করতে হবে। ২০২৬ সালের নতুন শিক্ষা সংস্কার কর্মসূচিতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্পকে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। যাতে শিক্ষক জটিল বৈজ্ঞানিক থিওরিগুলো সিমুলেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেখাতে পারেন।
৩. ইন্টার্নশিপ ও স্বল্পমেয়াদী শিক্ষকতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর সেমিস্টারের বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের ক্রেডিট-ভিত্তিক ইন্টার্নশিপ হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলে পড়ানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে যেমন শিক্ষক সংকট কমবে, তেমনি তরুণরা শিক্ষকতার প্রতি আকৃষ্ট হবে।
৪. গবেষণায় বরাদ্দ ও উদ্ভাবন অনুদান
মাধ্যমিক পর্যায়ের বিজ্ঞান শিক্ষকদের জন্যও ছোট ছোট গবেষণা প্রকল্প বা ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ চালু করা প্রয়োজন। এতে তারা নিজেদের কেবল ‘লেকচারার’ নয়, বরং একজন ‘মেন্টর’ হিসেবে আবিষ্কার করার সুযোগ পাবেন।
গল্পের শেষটা ভিন্ন হতে পারত
ফিরে আসি কুড়িগ্রামের সেই স্কুলে। যদি সরকার একটি ‘ন্যাশনাল স্টেম ফেলোশিপ’ চালু করত, তবে হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের মেধাবী ছাত্র ফাহিম আজ কুড়িগ্রামের সেই ক্লাসরুমে বসে শিক্ষার্থীদের শেখাতেন কীভাবে একটি সাধারণ বীজগণিতের সূত্র দিয়ে মহাকাশ গবেষণার জটিলতা সমাধান করা যায়।
শিক্ষার্থীরা কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য বিজ্ঞান পড়ত না, তারা পড়ত পৃথিবীটাকে বদলে দেওয়ার জন্য। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির উন্নতির ইঞ্জিন হলো তার গবেষণাগার, আর সেই ইঞ্জিনের চালক হলেন বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষক।
উপসংহার: ইট-কাঠের দালান আর কোটি টাকার ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম তখনই সার্থক হবে, যখন সেখানে একজন প্রাণবন্ত শিক্ষক থাকবেন। স্টেম শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে কেবল বিজ্ঞান বাড়ানো নয়, বরং আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো একটি সাহসী ও মেধাবী প্রজš§ গড়ে তোলা। নীতিনির্ধারকদের এখন সময় এসেছে শিক্ষকতাকে ‘সেবা’ থেকে ‘সেরা ক্যারিয়ারে’ রূপান্তর করার।
বাংলাদেশ কি সেই সাহসী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত? মফিজুল ইসলামদের চোখ এখন সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post